আশুতোষ ভট্টাচার্য - E-Learning Bengali

Bengali E-Learning
Go to content
আশুতোষ ভট্টাচার্য  (১৭ জানুয়ারি ১৯০৯-১৯ মার্চ ১৯৮৪)

বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতিবিদ, সাহিত্যিক এবং অধ্যাপক ছিলেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। তাঁর প্রধান পরিচয় একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকসংস্কৃতিবিদ হিসেবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকসাহিত্যকে স্নাতকোত্তর বাংলা সাহিত্য বিভাগে পঠনপাঠনের বিশেষ পত্ররূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এবং অসামান্য কৃতিত্বের জন্য আশুতোষ ভট্টাচার্যের নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জন্ম ও পরিবার

আশুতোষ ভট্টাচার্যের জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯০৯ সালে বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার ঝালুয়া গ্ৰামে। তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। ৭৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ড. সনৎকুমার মিত্রের সম্পাদনায় "সম্বর্ধনা সঙ্কলন' গ্রন্থ বিভিন্ন প্রবন্ধের উল্লেখ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে তাঁর জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯০৯ সালে। পিতা মুরারিমোহন ভট্টাচার্য পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবি। মাতা কুমুদিনী দেবী ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী ও স্বামীযোগ্যা স্ত্রী। তাদের আটজন সন্তানের মধ্যে আশুতোষ ভট্টাচার্য ছিলেন পুত্রদের মধ্যে জেষ্ঠ্য।
শিক্ষা জীবন

আশুতোষ ভট্টাচার্য একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পাঠশালা থেকে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে আজিমউদ্দিন ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২৬ সালে কিশোরগঞ্জ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে ঢাকা ইন্টার মিডিয়েট কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও বাংলা অনার্স নিয়ে বি. এ পাশ করেন। ১৯৩২ সালে প্রথম শ্রেণীতে এম. এ পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে পি. এইচডি ডিগ্রি ও লাভ করেন। পরে ড: সুশীল কুমার দে এর তত্বাবধানে Later History of Chaitanya Movement বিষয়ে গবেষণা আরম্ভ করেন।
কর্মজীবন

গবেষণার কাজ সম্পন্ন না করেই ১৯৩৩ সালের ৩৩ জুলাই আসানসোল ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে পরিচালিত ভার্নাকুলার স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানে শিক্ষকতার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনার ডাক আসে। ১৯৩৭ সালের ২ আগস্ট তিনি সেই কাজে নিযুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা চলাকালে তাঁর "বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস'(১৯৩৯)  প্রকাশিত হয়। ১৯৪৭ সালে ১৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Anthropological survey of India তে প্রখ্যাত নৃতত্ববিদ ড: ভেরিয়ার এলউইনের তত্ত্বাবধানে Primitive Religion and Folk Culture বিষয়ে  Research Associate  হিসেবে সাত বছর কাজ করেন এবং পরে ভারতের অন্যান্য প্রান্তে উপজাতীয় জীবনধারা ও সংস্কৃতির সন্ধানে পর্যটন ও অভিজ্ঞতাকে দেশ-বিদেশের পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকেন। অনেক বাঁধা অতিক্রম করে ১৯৫৫ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬১ সালে ২ ফেব্রুয়ারি রীডার পদে ও ১৯৬৭ সালের ৪ আগষ্ট রবীন্দ্র অধ্যাপকের আসন লাভ করে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে স্থায়ী চাকরি শেষ হলেও আরও তিন বছর পুনর্নিয়োগে বহাল থাকেন। ১৯৭৮ সালে কিছুদিন খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত ছিলেন।
সাহিত্য জীবন

কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু হয়। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর কবিতা রচনা শুরু হয়। শিক্ষকরা তাঁর কবিতা রচনার প্রশংসা করেছিলেন কিন্তু পিতা তাতে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন কারণ কবিতা রচনায় আগ্ৰহী থাকলে পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়তে পারেন। কলেজ ছাত্রাবাস থেকে "অস্ফুট'  পত্রিকার ১ম সংখ্যায় ২টি কবিতা "পোষ্যপুত্র' ও "দান' এবং ১টি গল্প "মাটির দান' প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বর্ষের "অস্ফুট' তাঁর ও আব্দুল ওয়াহাব মাহমুদের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তাতে ছিল ২টি কবিতা, ২টি প্রবন্ধ এবং ১টি গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ক্লাসে ভর্তির সময় বিভাগীয় প্রধান প্রশ্ন করেছিলেন "রাজনীতিতে যুক্ত কি না?' তিনি বলেছিলেন "না'। কিন্তু তখন ঢাকার এক বিপ্লবী কেন্দ্রে নিয়মিত বীররসের কবিতা পাঠ করে বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁর একটি ছদ্মনাম ছিল বাৎস্যায়ন ভট্ট। ঢাকা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় স্বনামে ও ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। তিনি অনেক কাব্য রচনা করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ "মধুমালা' (১৯৩৫) সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ "আজব বেদে', রবার্ট ব্রাউনিং এর  Piper of Hamelin এর সচিত্র অনুবাদ প্রকাশিত হয়। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে অনেক গল্প রচনা করেন। প্রথম গল্প "মনের আগুন' (১৯৩৬), দ্বিতীয় গল্প "বনতুলসী' (১৯৬১) অনেক দিন পর প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস "ত্রিশরণ', এবং দ্বিতীয় উপন্যাস "অস্তায়মান'। কালিদাসের "ঋতুসংহার' অনুবাদ করেন কিন্তু তা গ্ৰন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে তাঁর প্রথম গবেষণা গ্ৰন্থ "বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস' (১৯৩৯) সালে প্রকাশিত হয়। তার পর ক্রমন্বয়ে প্রকাশিত হয়
  • বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস - ১ম (১৯৫৬)
  • বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৫৮)
  • গীতিকবি মধুসূদন (১৯৬০)
  • আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৬৩)
  • বাংলা কথা সাহিত্যের ইতিহাস-১ম (১৯৬৪)
  • মহাকবি শ্রী মধুসূদন (১৯৬৪)
  • বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস (১৯৬৬)
  • রবীন্দ্র নাট্যধারা (১৯৬৬)
  • নাট্যকার শ্রী মধুসূদন (১৯৬৮)
  • বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ পর্যায়ের উপন্যাস (১৯৮৯)।

বাংলার লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে গ্ৰন্থাগার বিজ্ঞানে যাকে "হ্যান্ডবুক' বলা হয় সেই স্বীকৃতি আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। পরবর্তীতে ছড়া, লোককথা, প্রবাদ, ধাধাঁ ইত্যাদি নিয়ে বাংলা লোকসাহিত্য-২য় (১৯৬৩) ঐ-৩য় (১৯৬৫) ঐ ৪র্থ (১৯৬৬) ঐ ৫ম (১৯৬৯) ঐ ৬ষ্ঠ ( ১৯৭২) প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে সফল লোকসাহিত্য গবেষকের পুরস্কার তাঁরই প্রাপ্য।

১৯৬৪ সালে পরিদর্শক অধ্যাপক হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নে অবস্থানকালে তাঁর অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে সোভিয়েতে বঙ্গ সংস্কৃতি (১৯৬৫), প্যারিস ভ্রমণের ভিত্তিতে পুরুলিয়া থেকে প্যারিস (১৯৭৫), এবং যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন স্থানে ছৌ- নৃত্য প্রদর্শন ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাদান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পুরুলিয়া থেকে আমেরিকা (১৯৭৬), সুন্দরী ইন্দোনেশিয়া (১৯৭৬), ইরাণ ভ্রমণ (১৯৭৬), অজানা অষ্ট্রেলিয়া (১৯৭৮) , জাপানের আঙ্গিনায় (১৯৮১), অন্ধকারের আন্দামানে (১৯৮৩) প্রকাশিত হয়।

পত্র-পত্রিকা ছাড়াও তাঁর সম্পাদনায় ত্রৈমাসিক "লোকশ্রুতি' (১৯৬৮) প্রকাশিত হয়। তিনি রামকৃষ্ণ দাসের "শিবায়ন', গোপীচন্দ্রের গান, দীনবন্ধু মিত্রের "নীলদর্পণ'  (১৯৬৯), গিরিশচন্দ্র ঘোষের "প্রফুল্ল' (১৯৬৪), বাংলা প্রবন্ধ ও রচনারীতি, মোহিতলাল মজুমদারের সাথে যৌথভাবে গদ্য সঞ্চয়ন (১৯৭০), ড. অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়ের সাথে যৌথভাবে কৃত্তিবাসী রামায়ণ (১৯৭৬), কাশীদাসী মহাভারত (১৯৭৬), বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরানী (১৯৭৬) রচনা করেন।

রবীন্দ্রনাথের মত তিনিও পিতার কাছে স্বীকৃতি পাননি তবে বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃতিতে এক নতুন পথের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সেই পথে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে গৌরব অর্জন করেছে। সুতরাং, তিনি উভয়দিকেই স্বার্থকতা লাভ করেছেন। তাঁর বিষয় এবং শিক্ষাদানে তিনি অতুলনীয় এ কথা অস্বীকার করা যায় না।
পুরস্কার

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক হিসেবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরোজিনী বসু স্মৃতিপদক (১৯৮৩), দিল্লির সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির ফেলো (১৯৬৭) নির্বাচিত হন।
মৃত্যু

১৯ মার্চ ১৯৮৪ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্রবন্ধ: রিয়া রায়
তথ্যসূত্র:
১. বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ, ড. বরুণ কুমার চক্রবর্তী
২. উইকিপিডিয়া
(প্রকাশিত: ০৯.০৬.২০২১)
There are no reviews yet.
0
0
0
0
0

Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content