রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ

Bengali E-Learning
Go to content

রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ

E-Learning Bengali
রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ
রামকৃষ্ণ (১৮৩৬ – ১৮৮৬) ও রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১ – ১৯৪১) এই দুই যুগপুরুষের মানসভূমিতে তাঁদের ব্যক্তিসত্তার অনুসন্ধান, কিম্বা, দু’জনে পরস্পরের সাথে কতখানি সম্পৃক্ত-অসম্পৃক্ত তা পর্যালোচনা করা এই নিবন্ধকারের অভীষ্ট নয় | তাঁদের নিজ নিজ মানসভূমিতে একটি অনুসন্ধানের চেষ্টা, সেই সত্তাকে, যেখানে উভয়ে এক গোত্রীয়—উভয়েই লোক শিক্ষক | উভয়ে কবি—একজন কবি-সাধক, অন্যজন সাধক-কবি, উভয়ে স্রষ্টা—একজন শিল্প ও সাহিত্যের, অন্যজন শিবজ্ঞানে জীবসেবার, উভয়ে দ্রষ্টা—সত্যের ও ত্রিকালের, উভয়ে সাধক—একজন সত্য ও সুন্দরের, অন্যজন সত্য ও সুন্দরের প্রতিমূর্তি সাকার ঈশ্বরের | উভয়েই একই পুকুরের দুই ভিন্ন ভিন্ন ঘাটের জল সংগ্রহকারী | একজন চেয়েছিলেন সীমার মাঝে অসীমকে উপলব্ধি করতে, অন্যজন চেয়েছিলেন মৃন্ময় সত্তাকে চিন্ময়ী সত্তারূপে কাছে পেতে |
রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ—এই দুই যুগপুরুষ অনেকদিক থেকেই ব্যতিক্রমী | রামকৃষ্ণের মুখের ভাষা ও ব্যবহৃত উপমা সাবলীল ও বলিষ্ঠ, সহজ-সরল | সহজেই স্পর্শ করে যেকোনো মেধাকে | উপমা প্রয়োগে উপমেয় হয় স্পষ্টতর | রবীন্দ্রনাথের মুখের কথা কিম্বা লেখার ভাষা মেধা নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি, এমন মত প্রকাশ করার দুঃসাহস আমার নেই | তবে তাঁর অতীন্দ্রিয় বোধের প্রকাশ যেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে, সেখানে ভাব ব্যাপক ও গভীর, ও তা স্পর্শ করে মেধা, প্রজ্ঞা ও সংস্কারমুক্ত মনন-কে | জগৎ ও জীবনকে উপলব্ধি করার দ্যোতক রামকৃষ্ণের কাছে-‘ঈশ্বর’ লাভ, আর রবীন্দ্রনাথের কাছে-‘সৎ’-‘চিৎ’-‘আনন্দ’ |
রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ পর্যালোচনায় রয়েছে দু’টি বৃত্ত | একটি বৃত্তের পরিধি ১৮৬১ থেকে ১৮৮৬‌, দীর্ঘ ২৫ বছর, যেখানে রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ উভয়েই রয়েছেন স্থূলদেহে এই সুন্দর পৃথিবীতে | অপর বৃত্তের পরিধি ১৮৮৬ থেকে ১৯৪১-দীর্ঘ ৫৫ বছর, যেখানে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব স্থূলদেহ ত্যাগ করলেও রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন ‘জগতের আনন্দযজ্ঞে’ ও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মে এসেছে রামকৃষ্ণ-প্রসঙ্গ |
১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন ঠাকুরবাড়িতে | রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৫ | শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত-গ্রন্থে তার উল্লেখ আছেঃ
‘একদিন ধরে বসলুম, দেবেন্দ্র ঠাকুরের বাড়ি যাব। সেজোবাবুকে বললুম, দেবেন্দ্র ঈশ্বরের নাম করে, তাকে দেখব, আমাকে লয়ে যাবে? সেজোবাবু-তার আবার ভারী অভিমান, সে সেধে লোকের বাড়ি যাবে? এগু-পেছু করতে লাগল। তারপর বললে, হাঁ, দেবেন্দ্র আমি একসঙ্গে পড়েছিলুম, তা চল বাবা, নিয়ে যাব। ...দেবেন্দ্র ভালো লোক...কিন্তু যারা সংসারে না ঢুকিয়া ছেলেবেলা থেকে শুকদেবাদির মতো অহর্নিশ ঈশ্বরের চিন্তা করে, কৌমার বৈরাগ্যবান, তারা ধন্য। ...যখন সেজোবাবুর সঙ্গে ওর বাড়িতে গেলাম, দেখলাম ছোট ছোট ছেলে অনেক—ডাক্তার এসেছে, ঔষধ লিখে দিচ্ছে।’
উল্লেখিত মেজোবাবু মথুরামোহন বিশ্বাস, যিনি জয়নারায়ণ বিশ্বাসের কনিষ্ঠপুত্র ও দেবেন্দ্রনাথের সহপাঠী |
রামকৃষ্ণ-দেবেন্দ্র মিলন প্রসঙ্গে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ গ্রন্থে রামকৃষ্ণ বলেছেন—
‘অনেক কথাবার্তার পর দেবেন্দ্র খুশি হয়ে বললে, “আপনাকে উৎসবে (ব্রাহ্মোৎসব) আসতে হবে।” আমি বললাম, “সে ঈশ্বরের ইচ্ছা; আমার তো এই অবস্থা দেখছ! —কখন কিভাবে তিনি রাখেন।” দেবেন্দ্র বললে, “না আসতে হবে; তবে ধুতি আর উড়ানি পরে এসো—তোমাকে এলোমেলো দেখে কেউ কিছু বললে, আমার কষ্ট হবে।” আমি বললাম, “তা পারব না। আমি বাবু হতে পারব না।” দেবেন্দ্র, সেজোবাবু সব হাসতে লাগল।’
শান্তিনিকেতন থেকে ৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৬, বৃহস্পতিবার, রবীন্দ্রনাথ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়-কে একটি চিঠি লেখেনঃ
‘শ্রদ্ধাস্পদেষু,
রামকৃষ্ণ পরমহংস যেদিন আমাদের বাড়িতে পিতৃদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম কিন্তু তাঁদের পরস্পরের সাক্ষাৎকারের স্থলে উপস্থিত ছিলাম না। নিবেদিতার মুখের ভাবে অনুভব করেছিলুম তিনি সন্তুষ্ট হন নি। তিনি পরমহংসদেবকে যথোচিত শ্রদ্ধা করেন নি সেটা অসম্ভব নয। কেননা তিনি একেবারেই বিগ্রহ মানতেন না, এবং উপনিষদের অনুশাসন অনুসারে তাঁর চিরজীবনের সাধনা ছিল শান্ত সমাহিত আত্মসংযতভাবের।...’
রবীন্দ্রনাথ-রামকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ মিলন ঘটেছিল ২ মে, ১৮৮৩ (২০ বৈশাখ, ১২৯০) বুধবার কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে | শ্যামবাজারের নন্দনবাগানের ব্রাহ্মসমাজের সাংবাৎসরিক উৎসবে | রামকৃষ্ণের বয়স তখন ৪৭, আর রবীন্দ্রনাথ ২২ অতিক্রান্ত যুবক | এই দিনের বর্ণণায় কথামৃতকার লিখেছেনঃ
‘ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নন্দনবাগান ব্রাহ্মসমাজ-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। ব্রাহ্মভক্তদের সহিত কথা কহিতেছেন। সঙ্গে রাখাল, মাস্টার প্রভৃতি আছেন। বেলা পাঁচটা হইবে।
কাশীশ্বর মিত্রের বাড়ি নন্দনবাগানে তিনি পূর্বে সদরওয়ালা ছিলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজভুক্ত ব্রাহ্মজ্ঞানী। তিনি নিজের বাড়িতেই দ্বিতলায় বৃহৎ প্রকোষ্ঠ মধ্যে ঈশ্বরের উপাসনা করিতেন, আর ভক্তদের নিমন্ত্রণ করিয়া মাঝে মাঝে উৎসব করিতেন, তাঁহার স্বর্গারোহণের পর শ্রীনাথ, যজ্ঞনাথ প্রভৃতি তাঁহার পুত্রগণ কিছুদিন ওইরূপ উৎসব করিয়াছিলেন। তাঁহারাই ঠাকুরকে অতি যত্ন করিয়া নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছেন।’
ঠাকুর প্রথমে আসিয়া নিচে একটি বৈঠকখানা ঘরে আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন | সে ঘরে ব্রাহ্মভক্তগণ ক্রমে ক্রমে আসিয়া একত্রিত হইয়াছিলেন | শ্রীযুক্ত রবীন্দ্র (ঠাকুর) প্রভৃতি ঠাকুরবংশের ভক্তগণ এই উৎসব ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন |
সেদিনের ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেছে ‘The Statesman’ ইংরেজি সংবাদপত্রেঃ
‘CALCUTTA
The Shambazar Brahmo Somaj
This Somaj celebrated its 20th anniversary at the residence of Baboo Srinath Mitra and brothers in North Circular Road on Wednesday last. The prayer-hall was modestly and tastefully decorated with flowers and evergreens. From early morning hymns were sung till 7 when divine service commenced. In the afternoon Ramkrishna Paramahansa, the sage of Dukhineswar, discoursed on morality and religion. The evening service commenced at 7.30, The Pundit Sibnath Sastri M.A., and Baboo B.C. Banerjee officiating. The choir was led by Baboo Rabindra Nath Tagore.’
এই ঘটনার পর রামকৃষ্ণ স্থূলদেহে ছিলেন আর ৩ বছর ৩ মাস ১০ দিন | কিন্তু এই সময়কালের মধ্যে রামকৃষ্ণ-রবীন্দ্রনাথ মিলনের আর কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি | তবে প্রথম বৃত্তের কালপর্বে রামকৃষ্ণ রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছেন, নরেন্দ্রনাথ তথা স্বামী বিবেকানন্দের কন্ঠে | রামকৃষ্ণ-কে নরেন্দ্রনাথ শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা ছয়টি গান |
১. ‘গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে,...’
নরেন্দ্রনাথ-এর কন্ঠে দু’বার শুনেছেন রামকৃষ্ণ | প্রথমবার ২৫ চৈত্র, ১২৮৯ (৭ এপ্রিল, ১৮৮৩), দ্বিতীয়বার ২৭ বৈশাখ, ১২৯২ (৯ মে, ১৮৮৫)
২. ‘দিবানিশি করিয়া যতন...’
নরেন্দ্রনাথ-এর কন্ঠে একবার শুনেছেন এই গান রামকৃষ্ণ, ৩০ ভাদ্র, ১২৯১ (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৪)
৩. ‘দুখ দূর করিলে,   দরশন দিয়ে...’
এইগান রামকৃষ্ণ দুবার শুনেছেন নরেন্দ্রনাথের কন্ঠে, ২৯ ফাল্গুন, ১২৯১ (১১ মার্চ, ১৮৮৫) ও ৬ বৈশাখ, ১২৯৩ (১৮ এপ্রিল, ১৮৮৬)
৪. ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,...’
দু’বার শুনেছেন রামকৃষ্ণ, ৩১ আষাঢ়, ১২৯২ (১৪ জুলাই, ১৮৮৫), ও ৯ কার্তিক, ১২৯২ (২৪ অক্টোবর, ১৮৮৫)
৫. ‘মহাসিংহাসনে বসি   শুনিছ, হে বিশ্বপিত,...’
একবার শুনেছেন রামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথ-এর কন্ঠে, ৯ কার্তিক, ১২৯২ (২৪ অক্টোবর, ১৮৮৫)
৬. ‘একি এ সুন্দর শোভা!...’
গানটি নরেন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন ১২ কার্তিক, ১২৯২ (২৭ অক্টোবর, ১৮৮৫) মঙ্গলবারে, শ্যামপুকুর বাটিতে | রামকৃষ্ণ তখন অসুস্থ, চিকিৎসা চলছে | গান শুনে রামকৃষ্ণের প্রতিক্রিয়ার কথা লিখছেন কথামৃতকারঃ
‘তিনি (রামকৃষ্ণ) গভীর ভাব সমাধিতে মগ্ন হইলেন। শরীর স্পন্দহীন, নয়ন স্থির। অবাক্! কাষ্ঠপুত্তলিকার ন্যায় উপবিষ্ট। বাহ্যশূন্য! মন বুদ্ধি অহংকার চিত্ত সমস্তই অন্তর্মুখ। আর সে মানুষ নয়। নরেন্দ্রের মধুর কণ্ঠে মধুর গান চলিতেছেঃ এ কি এ সুন্দর শোভা...’।
দ্বিতীয় বৃত্তের কালপর্ব ১৮৮৬র ১৬ আগস্ট থেকে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট পর্যন্ত বিস্তৃত | ১৮৮৬ থেকে ১৯০৮, ২২ বছরের এই কালপর্বে রবীন্দ্র সৃষ্টিকর্মে রামকৃষ্ণ প্রসঙ্গ প্রত্যক্ষত না থাকলেও বিবেকানন্দ, নিবেদিতা ও বিভিন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন সাক্ষাতে রামকৃষ্ণ ভাব-আন্দোলনের বৃত্তে বারবার দেখতে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথকে | সে ইতিহাস দীর্ঘ | উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে—১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই (২০ আষাঢ়, ১৩০৯) শুক্রবারে বিবেকানন্দের প্রয়াণের পর ২৮ আষাঢ়, শনিবারে, সাউথ সুবার্বান স্কুলে যে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে রবীন্দ্রনাথ সভাপতির ভাষণ দেন | ১৫ জুলাই (৩১ আষাঢ়) মঙ্গলবারে সেই বিবরণ প্রকাশিত হয় ‘The Bengalee’ পত্রিকায় | ১৩ অক্টোবর, ১৯০৪ (২৭ আশ্বিন, ১৩১১) বৃহস্পতিবারে গয়ার বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউটের উদ্বোধনী সভায় রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত হয়েছিলেন | সে সংবাদ ‘The Bengalee’ পত্রিকায় ২৩ অক্টোবর (৭ কার্তিক) রবিবারে প্রকাশিত হয় |
১৩১৫ বঙ্গাব্দের ১২ জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে ১৯০৮) সোমবারে হীরেন্দ্রনাথ দত্তের সভাপতিত্বে চৈতন্য লাইব্রেরির উদ্যোগে মিনার্ভা থিয়েটারে ‘পথ ও পাথেয়’ শীর্ষক একটি লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন রবীন্দ্রনাথ | এই প্রবন্ধে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমিকায় সশস্ত্র গুপ্ত আন্দোলনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে এবং আর্য-অনার্য সম্মিলন ক্ষেত্ররূপ ভারতবর্ষে খণ্ডতা ও ক্ষুদ্রতাকে অখণ্ড বৃহত্ত্বের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টায় যে সমস্ত মনীষী স্মরণযোগ্য তাঁদের মধ্যে রামমোহন রায়, দয়ানন্দ, কেশবচন্দ্র প্রমুখ মনীষীদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে রবীন্দ্রনাথ লেখেনঃ
‘রামমোহন রায়, স্বামী দয়ানন্দ, কেশবচন্দ্র, রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দ, শিবনারায়ণ স্বামী, ইঁহারাও অনৈক্যের মধ্যে এককে, ক্ষুদ্রতার মধ্যে ভূমাকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য জীবনের সাধনাকে ভারতবর্ষের হস্তে সমর্পণ করিয়াছেন।’
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের সময়কালে ভারতে জাগ্রত হয়েছিল নবজাগ্রত হিন্দুধর্ম এবং সেই হিন্দুধর্মের সঙ্গে ব্রাহ্মধর্মের মিলনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ | এই কালপর্বে বাংলা তথা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে নবজাগ্রত হিন্দুধর্মের প্রচার ও প্রসারের অন্যতম নায়ক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ | বিবেকানন্দের ভাব-ভাবনার উৎসভূমি ছিল রামকৃষ্ণ আদর্শ |
নিরাকার-ব্রহ্মে বিশ্বাসী ব্রাহ্মবাদী রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি সম্ভবত এড়িয়ে যায়নি কথামৃতে বর্ণিত ৫ আগস্ট, ১৮৮২ (২১ শ্রাবণ, ১২৮৯) শনিবারের ঘটনাটি | উক্ত দিনে কলকাতার বাদুড়-বাগানে বিদ্যাসাগরের গৃহে মিলন হয়েছিল রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের | কথোপকথনে উঠে এসেছিল ব্রহ্ম প্রসঙ্গ | রামকৃষ্ণ বলেছেনঃ
“ব্রহ্ম—বিদ্যা ও অবিদ্যার পার। তিনি মায়াতীত। ব্রহ্ম যে কি মুখে বলা যায় না। সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে। ...কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয় নাই, সে জিনিসটি ব্রহ্ম।”
রামকৃষ্ণের মুখে ব্রহ্মব্যাখ্যা শুনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বীকার করে নিয়েছেন— পুরোনো তত্ত্বের নবজাগ্রত চেতনাকে, পুরোনো চিন্তনের নবতম সংস্করণকে |
ব্রহ্মবাদকে ব্যাখ্যা করে বিদ্যাসাগরকে গল্প শুনিয়েছেন রামকৃষ্ণঃ
‘এক বাপের দুটি ছেলে। ব্রহ্মবিদ্যা শিখবার জন্য ছেলে দুটিকে, বাপ আচার্যের হাতে দিলেন। কয়েক বৎসর পর তারা গুরুগৃহ থেকে ফিরে এল, এসে বাপকে প্রণাম করলে। বাপের ইচ্ছা দেখেন, এদের ব্রহ্মজ্ঞান কিরূপ হয়েছে। বড় ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাপ! তুমি তো সব পড়েছ, ব্রহ্ম কিরূপ বল দেখি?” বড় ছেলেটি বেদ থেকে নানা শ্লোক বলে ব্রহ্মের স্বরূপ বোঝাতে লাগল। বাপ চুপ করে রইলেন। যখন ছোট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে হেঁটমুখে চুপ করে রইল। মুখে কোন কথা নেই। বাপ তখন প্রসন্ন হয়ে ছোট ছেলেকে বললেন “বাপু! তুমিই একটু বুঝেছ। ব্রহ্ম যে কি, মুখে বলা যায় না।”’
রামকৃষ্ণের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘Probuddha Bharat’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘To the Paramhansa Ramkrishna Deba’ শীর্ষক রবীন্দ্রনাথ লিখিত ইংরাজি কবিতাটিঃ
‘Diverse courses of worship
from varied springs of fulfilment
have mingled in your meditation.
The manifold revelation of the joy
of the Infinite
has given from to a shrine of unity
in your life,
wherefrom far and near arrive salutations,
to which I join my own.’
রচনাটির নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া না গেলেও একথা সহজেই অনুমান করা যায় উক্ত রচনাটি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির আগের কোনো এক সময়ের রচনা | রচনাটির বঙ্গানুবাদও করেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং |
পরমহংস রামকৃষ্ণদেব
‘বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা।
তোমার জীবনে অসীমের লীলা পথে
নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;
দেশবিদেশের প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।’
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৩৭ সালের ১লা  থেকে ৮ই মার্চ রামকৃষ্ণ সেন্টিনারি কমিটির উদ্যোগে কলকাতায় একটি ধর্ম মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় | আট দিনের এই অনুষ্ঠানে সকাল ও সন্ধ্যা মিলিয়ে মোট ১৫ টি অধিবেশন হয়েছিল |
বিভিন্ন অধিবেশনে ভাষণ দেন— স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, ড. সি. এল. চেন, স্বামী অভেদানন্দ, কাকা কালেকর, ড. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী পরমানন্দ, স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহ্যাজব্যান্ড, অধ্যাপক মহম্মদ আলি শিরাজি, ড. ডি. আর. ভাণ্ডারকর, মহামহোপাধ্যায় প্রমথনাথ তর্কভূষণ, শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু, মাদাম আদেলীনা দেল কারীল দে গুইরলদেস্, শ্রীমৎ স্বামী ভাগবতানন্দজী, ড. এফ. ভি. তুসেফ, অধ্যাপক এ. বি. ধ্রুব |
কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান তথা কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায় অভ্যর্থনা ভাষণ দেন | ধর্মমহাসভায় প্রেরিত বা পঠিত রচনার সংখ্যা ছিল ১১০টি |
দেশীয় লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন—ড. সুশীলকুমার মৈত্র, ড. বিনয়কুমার সরকার, ড. নীলরতন ধর, ড. নারায়ণ মেনন, স্যার জাহাঙ্গীর কয়াজি, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অধ্যাপক নলিনাক্ষ দত্ত, অধ্যাপক গুরুমুখ নিহাল সিং, মাদাম সোফিয়া ওয়াদিয়া, অধ্যাপক বটুকনাথ ভট্টাচার্য, শরৎচন্দ্র বসু, অধ্যাপক অধরচন্দ্র দাস, ড. সরোজকুমার দাস, দেওয়ান বাহাদুর কে.এস. রামস্বামী শাস্ত্রী, ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার, ড. প্রভুদত্ত শাস্ত্রী, গুরুসদয় দত্ত, ড. এ. সি. উকিল, শ্রীমতী সরলা দেবীচৌধুরানী, অধ্যাপক দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী, অধ্যাপক হরিদাস ভট্টাচার্য, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ড. ভগবান দাস, রায়বাহাদুর সি. রামানুজাচার্য |
ভারতের বাইরে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মনীষীদের লিখিত ৩৫টি রচনা এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে এসেছিল | প্রেরকরা হলেন— এম. উইন্টারনিৎস, এ.বি. কীথ, জা এবর, পল ম্যাসন, অরসেন, জি এল ডুপার্ট, চার্লস এ. এলউড প্রমুখ |
ভারতের বাইরে যে সমস্ত দেশ থেকে শুভেচ্ছাবাণী ও রচনা এসেছিল সেগুলি হল—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, পোলান্ড, হল্যান্ড, রোম, ইটালি, ইজিপ্ট, ইরাক, ইরান, মরিশাস, মালয়, তিব্বত, চেকোশ্লোভাকিয়া, যুগোশ্লাভাকিয়া, সুইজারল্যান্ড, রুমানিয়া, বেলজিয়াম, ব্যাভেরিয়া |
সংগঠকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ড. বিনয়কুমার সরকার |
৩ রা মার্চ অপরাহ্ণের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ড. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | রবীন্দ্রনাথের ঐদিনের বক্তৃতা পুস্তিকাকারে মুদ্রিত হয়েছিল |
Sri Ramakrishna Centenary Parliament of Religions, Address by Rabindranath Tagore, Town Hall, Calcutta 3rd March, 1937, Pages 9, Art Press, Calcutta.
যদিও রবীন্দ্রনাথের শারীরিক অসুস্থতার কারণে এই অধিবেশন হয় কলেজ স্কোয়ারস্থ ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে | ৪ মার্চ, ১৯৩৭ অমৃতবাজার পত্রিকা তার প্রতিবেদনে লেখেঃ
‘Amrita Bazar Patrika (March 4, 1937)
Tributes to Paramahansa
Poet’s Message
Need of a Living Recognition of Neglected Truth
The Religion and its Reality
A Twenty-five Minute Speech Before a Vast Audience in Parliament of Religions
“I venerate Paramahansa Dev because he, in an arid age of religious nihilism, proved the truth of our spiritual heritage by realising it, because the largeness of his spirit could comprehend seemingly antagonistic modes of ‘sadhana’, and because the simplicity of his soul shames for all time the pomp and pedantry of pontiffs and pundits.”
In these words, Poet Rabindra Nath Tagore paid a magnificent tribute to the memory of Ramkrishna Paramahansa when presiding at yesterday’s evening session of the Parliament of Religions at the Calcutta University Institute.
The vast assembly listened to the Poet’s address with rapt attention which he took twenty-five minutes to deliver. And the feelings of the audience found eloquent expression in the remarks which Sir Francis Younghusband, one of the most distinguished of the Overseas delegates, made in the Conference in rising to offer a vote of thanks to the Chair---that for this speech alone they might well consider the holding of this Parliament a success…’
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেনঃ
“যে ব্যক্তি সদাসর্বদা ঈশ্বর চিন্তা করে, সেই জানতে পারে, তাঁর স্বরূপ কি। সে ব্যক্তিই জানে যে, ঈশ্বর নানারূপে দেখা দেন। নানাভাবে দেখা দেন। তিনি সগুণ আবার নির্গুণ। গাছতলায় যে থাকে সেই জানে যে, বহুরূপীর নানা রঙ, আবার কখনো কখনো কোনো রঙই থাকে না, অন্য লোকে কেবল তর্ক ঝগড়া করে কষ্ট পায়।
তিনি সাকার, তিনি নিরাকার, কি রকম জানো? যেন সচ্চিদানন্দ সমুদ্র। কুল কিনারা নাই। ভক্তি হিমে সেই সমুদ্রের স্থানে স্থানে জল বরফ হয়ে যায়। যেন জল বরফ আকারে জমাট বাঁধে। অর্থাৎ ভক্তের কাছে তিনি সাক্ষাৎ হয়ে কখনো কখনো সাকার রূপ হয়ে দেখা দেন। আবার জ্ঞান সূর্য উঠলে সে বরফ গলে যায়।”
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ
‘তুমি       নব নব রূপে এসো প্রাণে,
এসো       গন্ধে বরনে, এসো গানে।।
                                 এসো   অঙ্গে পুলকময় পরশে,
                                 এসো   চিত্তে সুধাময় হরষে,
                                 এসো   মুগ্ধ মুদিত দু’নয়ানে।।                               
এসো       নির্মল উজ্জ্বল কান্ত,
এসো       সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত,
এসো       এসো হে বিচিত্র বিধানে।
                                 এসো    দুঃখে সুখে, এসো মর্মে,
                                 এসো    নিত্য নিত্য সব কর্মে,
                                 এসো    সকল-কর্ম-অবসানে।।’
রামকৃষ্ণের বচন যেমন ছিল তাঁর আত্মগত, তেমনি রবীন্দ্রনাথের লেখনীর ভাব ছিলো তাঁর ব্যক্তিগত | পার্থক্য ছিলো আঙ্গিকে, প্রকাশভঙ্গিতে ও ভাষায় | নিরাকার-ব্রহ্ম কিম্বা সাকার-দেবতা উভয়ই ইন্দ্রিয়াতীত দর্শন | রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ আমাদের ভূমি থেকে ভূমায় উত্তরণের কথা বলে গেছেন |
(ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক)




Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content