রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র

Bengali E-Learning
Go to content

রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র

E-Learning Bengali
রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র
রবীন্দ্রনাথ (৭.৫.১৮৬১-৭.৮.১৯৪১) ও জগদীশচন্দ্র (৩০.১১.১৮৫৮-২৩.১১.১৯৩৭), একজন সেরা কবি ও আরেকজন সেরা বিজ্ঞানী | দু’জনের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ২ বছর ৫ মাস ৭ দিন, কিন্তু, উভয়ের মধ্যে ছিল, প্রগাঢ় বন্ধুত্ব | প্রথমের দিকে উভয়ে উভয়কে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন, পরে তা ‘তুমি’-তে পরিণত হয় | জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেনঃ
‘আমার জীবনের প্রথম বন্ধুত্ব জগদীশের সঙ্গে | আমার চিরাভ্যস্ত কোণ থেকে তিনি আমাকে টেনে বের করেছিলেন যেমন করে শরতের স্নিগ্ধ সূর্যোদয়ের মহিমা চিরদিন আমাকে শোবার ঘর থেকে ছুটিয়ে বাইরে এনেছে |’
(রবীন্দ্র রচনাবলী / অষ্টাদশ খণ্ড/ বিশ্বভারতী)
রবীন্দ্রনাথ ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের স্কুল বিভাগে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন, তখন জগদীশচন্দ্র বসু ওখানে এন্ট্রান্স ক্লাসের ছাত্র | এই কলেজ, ইংরেজ জেসুইটদের দ্বারা স্থাপিত (১৮৩৫) | ১৮৬২-তে কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে | ভারতবর্ষে বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ ফাদার ইউজিন লাঁফো (Eugene Lafont / 26 March, 1837-10 May, 1908) ১০ অক্টোবর, ১৮৭১ তারিখ থেকে ওই কলেজের রেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন | ১৮৭৫ সালের ১১ মার্চ কবি-জননী সারদা দেবীর মৃত্যু হয় | ১৮৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কলেজে অনুষ্ঠিত এন্ট্রান্স পরীক্ষায় জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন | তখনো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি | ১৮৯১ সালে (১২৯৮) জগদীশচন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজে ফনোগ্রাফ যন্ত্রে রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীত রেকর্ড করলেও উভয়ের সম্পর্ক হতে শুরু করে ১৮৯৭ সাল থেকে (১৩০৪) | এই ঘনিষ্ঠতার সূচনা প্রসঙ্গে জগদীশচন্দ্রের জীবনীকার Patrick Geddes (1854-1932) লিখেছেনঃ ‘On the occasion of Bose’s return (Apr, 1897) from his successful visit to Europe in 1896, Tagore called to congratulate him and, not finding him at home, left on his work-table a great blossom of magnolia, as a fitting and characteristic message of regard. Since that time the two have been increasingly together, each complementing and thereby widening and deepening the other’s characteristic outlook on nature and life.’
(The Life and Work of Sir Jagadis C. Bose by Patrick Geddes / Longmans, Green, and Co. / 1920)
জগদীশচন্দ্র ২ নভেম্বর, ১৯০০ (১৭ কার্তিক, ১৩০৭) লন্ডন থেকে রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠিতে তা স্বীকার করেছেন:
‘তিন বৎসর পূর্ব্বে আমি তোমার নিকট একপ্রকার অপরিচিত ছিলাম | তুমি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ডাকিলে | তারপর একটি একটি করিয়া তোমাদের অনেকের স্নেহবন্ধনে আবদ্ধ হইলাম | তোমাদের উৎসাহধ্বনিতে মাতৃস্বর শুনিলাম |’
(প্রবাসী)
১৩০৪ বঙ্গাব্দের ৪ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ ‘অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসুর প্রতি’ এই শিরোনামে একটি কবিতা রচনা করেন |
বিজ্ঞান-লক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিমমন্দিরে
দূর সিন্ধুতীরে,
হে বন্ধু, গিয়েছ তুমি; জয়মাল্যখানি
সেথা হতে আনি
দীনহীনা জননীর লজ্জানত-শিরে,
পরায়েছ ধীরে |
বিদেশের মহোজ্জ্বল মহিমা-মণ্ডিত
পণ্ডিত-সভায়
বহু সাধুবাদধ্বনি নানা কণ্ঠরবে
শুনেছ গৌরবে!
সে ধ্বনি গভীর মন্দ্রে ছায় চারিধার
হ’য়ে সিন্ধুপার |
আজি মাতা পাঠাইছে—অশ্রুসিক্ত বাণী
আশীৰ্বাদখানি
জগৎ-সভার কাছে অখ্যাত অজ্ঞাত
কবিকণ্ঠে, ভ্রাতঃ!
সে বাণী পশিবে শুধু তোমারি অন্তরে
ক্ষীণ মাতৃস্বরে!
(চিঠিপত্র / ষষ্ঠ খণ্ড / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / ৪ঠা শ্রাবণ ১৩০৪ (19 July, 1897))
ঊনবিংশ শতকের শেষ দশক | বাংলার নবজাগরণে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এসেছে নবজোয়ার | স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবে তৈরি হয়েছে, ‘ডাকাতের দল’ | ডাকাত দলের মতো আগে থেকেই চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হত, ‘আজ তোমার বাড়িতে ডাকাতি করা হবে |’ এই ডাকাতির অর্থ কিন্তু আলাদা, যাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি দেওয়া হল, আসলে, তার বাড়িতে সেই রাতে বসবে সাহিত্য-আসর, সঙ্গে, আড্ডা ও খাওয়া-দাওয়া | ১৮৯৭ সালে ‘ডাকাতের দল’ বিলুপ্ত হয়ে নামকরণ হয় ‘খামখেয়ালী সভা’ | ‘খামখেয়ালী সভা’-র উদ্যোগে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক আড্ডা বসত বিভিন্ন জনের বাড়িতে | কখনো ‘প্রবাসী’ সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের গৃহে, কখনো চিত্তরঞ্জন দাশের রসা রোডের বাড়িতে, কখনো জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়িতে, কখনো জোড়াসাঁকোর ‘মহর্ষি ভবন’-এ | এই আড্ডায় যোগ দিতেন সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের দিকপাল মানুষেরা |  
যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকাতের দল’ কিংবা ‘খামখেয়ালী সভা’য় অংশগ্রহণ করতেন, তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধায় (১৮৭৬-১৯৩৮), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫), জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭), অবলা বসু (১৮৬৪-১৯৫১), ভগিনী নিবেদিতা (১৮৬৭-১৯১১), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩) ও তাঁর দুই কন্যা শান্তা দেবী ও সীতা দেবী, সরলা দেবী চৌধুরানী (১৮৭২-১৯৪৫), ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী (১৮৭৩-১৯৬০), সাহানা দেবী (১৮৯৭-১৯৯০), অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১-১৯৩৪), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), অমলা দাশ (১৮৮০-১৯২২),  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১), গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬৭-১৯৩৮), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫), দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৪-১৮৯৮), কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৬১-১৯২৩), জ্যোতির্ময়ী গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৯-১৯৪৫), ঊর্মিলা দেবী (১৮৮৩-১৯৫৬), বাসন্তী দেবী (১৮৮০-১৯৭৪), সরলা দাশ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য |
‘খামখেয়ালী সভা’-র আড্ডায় সাহিত্য-পাঠ, সংগীত পরিবেশন, বিবিধ বিষয়ের আলোচনা ছাড়াও রাগসঙ্গীতের মত উচ্চমার্গের গানও হত | আড্ডার পর হত বিবিধ ব্যঞ্জন সহযোগে আহার | ১৮৯৮ সালের ৩ অগাস্ট কবি সপরিবারে শিলাইদহে চলে যান জমিদারি দেখাশোনা করতে আবার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৪৯-১৯২৫) উদ্যোগে ‘ভারতীয় সঙ্গীত সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হলে ‘খামখেয়ালি সভা’-র বিলুপ্তি ঘটে | যদিও শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে বা বহমান পদ্মায় নৌকায় চেপে এই আড্ডার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন, রবীন্দ্রনাথ | সাথে, সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭) অবলা বসু (১৮৬৪-১৯৫১) ও ভগিনী নিবেদিতা (১৮৬৭-১৯১১) প্রভৃতি দের | কখনো কখনো ভগিনী ক্রিস্টিনকেও ডাকা হতো শাহজাদপুরে | ভগিনী ক্রিস্টিন অথবা ক্রিস্টিনা গ্রীন্সটাইডেল (১৮৬৬—১৯৩০) ছিলেন একজন শিক্ষিকা, সমাজসেবী এবং স্বামী বিবেকানন্দের অন্যতমা শিষ্যা | ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৬ সালে ক্রিস্টিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরে স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা প্রথম শোনেন যা তাঁকে বিশেষ রূপে প্রভাবিত করে | অতঃপর স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষা প্রদান করেন | ১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের (১৮৬৩-১৯০২) প্রয়াণের আব্যবহিত পূর্বে তিনি ভারতবর্ষে আগমন করেন | ১৯১১ সালে ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যুর পর তিনি তাঁর নারী-শিক্ষা বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন | দীর্ঘ দিন ভারতে বসবাস করার পর তিনি ১৯১৪ সালে আমেরিকা ফিরে যান |
দ্বারকানাথ (১৮৪৪-১৮৯৮)-কাদম্বিনীর (১৮৬১-১৯২৩) ৬ নম্বর গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়ির ছাদে রবীন্দ্রনাথ মাঘোৎসবের প্রস্তুতি হিসেবে গান শেখাতে আসতেন | শুনে শুনে সেই সব গান রপ্ত করে নিতেন বিভিন্ন বয়সের ছেলে-মেয়েরা | সেখানে যেসব যুবকেরা গান শিখতে আসতেন তাঁদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ, তিনিও ছিলেন | বেহালা হাতে অংশগ্রহণ করতেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী |
সেই সময় দুই বিখ্যাত পরিবারঃ ‘রায়-পরিবার’ ও ‘গাঙ্গুলী-পরিবার’ এদের মধ্যে গড়ে ওঠা সখ্যতা, শেষে আত্মীয়তার বন্ধন রচনা করে | গভীর প্রেমে বাঁধা পড়েন উপেন্দ্রকিশোর, দ্বারকনাথের কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে | আবার, রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলাদেবীর সঙ্গে দ্বারকানাথের স্ত্রী কাদম্বিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল |
জাতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক কাজকর্মে ও নারী-কল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে এই দুই মহিলা অংশগ্রহণ করতেন | প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের বোন স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৬-১৯৩২) ও কাদম্বিনী বসু (১৮৬১-১৯২৩) জাতীয় কংগ্রেসের সর্বপ্রথম দুই নারী সদস্য | কাদম্বিনী জাতীয় কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে ইংরেজিতে প্রাঞ্জল বক্তৃতা দিয়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন | দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনীর কন্যা জ্যোতির্ময়ী গঙ্গোপাধ্যায়ও (১৮৮৯-১৯৪৫) স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন |
শিলাইদহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রকে পল্লীভবনে আমন্ত্রণ জানান ও জগদীশচন্দ্র ১৩০৬ বঙ্গাব্দের চৈত্রের শেষে শিলাইদহে যান ও ফেরার সময় কৌতূহল-বশতঃ কয়েকটি রেশম-গুটি কলকাতায় নিয়ে আসেন | ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে লেখেনঃ
‘প্রজাপতিগুলি এখনও জন্মগ্রহণ করে নাই | গত শনিবার হইতে প্রত্যহ গুটিগুলিকে নাড়িয়া দেখিতেছি, ভিতরে যেন পূর্ণতর হইয়া আসিতেছে | আশঙ্কা হয় এত ঘন ঘন কম্পনে কীটের প্রাণবায়ু হয়ত বাহির হইয়া গিয়াছে | তাহা হইলেও একরূপ নিশ্চিন্ত হইতাম, কারণ যে এরণ্ড বৃক্ষের কথা বলিয়াছিলাম তাহার পাতাগুলি একেবারে নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে | সুতরাং এই দুর্ভিক্ষের সময় সহসা প্রজাবৃদ্ধি মনে করিয়া ভীত আছি | বিশেষতঃ লরেন্স সাহেবের নিকট আমি কি করিয়া মুখ দেখাইব জানি না |’
১৮৯৯ সালের ২৪মার্চ রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরা রওনা হন | ত্রিপুরার রাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের আমন্ত্রণে তাঁর ত্রিপুরা যাত্রা | রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে রাজা রাধাকিশোর মানিক্য ও জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে | এই সূত্রেই রাধাকিশোর মানিক্য, জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান সাধনায় অকৃপণ অর্থসাহায্যও করেছেন | ত্রিপুরার যুবরাজ বীরেন্দ্রকিশোর-এর বিবাহ হয় ২৪ ফাল্গুন ১৩০৬ (১৯০০ সালের ৭ মার্চ) | এই বিবাহে রাধাকিশোর মানিক্য রবীন্দ্রনাথ সহ জগদীশচন্দ্র বসু-কে আমন্ত্রণ জানান | তিনি লেখেন:
‘বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যাঁহাদের পাইলে এ শুভ ব্যাপার আনন্দে সম্পন্ন হয় তাঁহাদের কয়েকজনকে পাইলেই সুখী হইতে পারি | তাই আপনি, জ্যোতিবাবু, গগনবাবু, আশুবাবু (আশুতোষ চৌধুরী) ও যদি সুবিধা থাকে জগদীশবাবুকে এখানে দেখিতে ইচ্ছা করি | জগদীশবাবুর বিজ্ঞানশালা নির্ম্মাণ সম্বন্ধে আমার স্মরণ আছে | ভরসা করি উপরি উক্ত শুভ ব্যাপারে আপনি ত নিশ্চয়ই আসিবেন; সেই সময় আলাপ করিয়া যাহা সাব্যস্ত হয় সেরূপ করিতে প্রস্তুত রহিলাম |’
(রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা / গোবিন্দনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় ও হিমাংশুনাথ গঙ্গোপাধ্যায় / ত্রিপুরা আঞ্চলিক রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী সমিতি / আগরতলা / আশ্বিণ, ১৩৬৮)
রবীন্দ্রনাথের পুত্র-কন্যাদের সঙ্গেও জগদীশচন্দ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল | তাঁর লেখা ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে রবীন্দ্র-পুত্র রথীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ
‘আমার সঙ্গে তিনি গল্প করতেন, নানারকম খেলা শেখাতেন— ছোটো বলে উপেক্ষা করতেন না | আমি তাঁর স্নেহপাত্র হতে পেরেছি বলে আমার খুব অহংকার বোধ হত | আমি মনে মনে কল্পনা করতুম বড়ো হলে জগদীশচন্দ্রের মতো বিজ্ঞানী হব |
বর্ষার পর নদীর জল নেমে গেলে বালির চরের উপর কচ্ছপ উঠে ডিম পাড়ত | জগদীশচন্দ্র কচ্ছপের ডিম খেতে ভালোবাসতেন | আমাকে শিখিয়ে দিলেন কি করে ডিম খুঁজে বের করা যায় |’
(পিতৃস্মৃতি / রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর / জিজ্ঞাসা, কলকাতা / ১৩৬৭)
৬ বছরের মীরা দেবীর সঙ্গেও জগদীশচন্দ্রের প্রীতির সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল | জগদীশচন্দ্র তাঁর অনেক চিঠিতে মীরা দেবীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন | রথীন্দ্রনাথ, তাঁর পিতা রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্রের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেনঃ
‘একজন বিজ্ঞানী, অন্যজন কবি— এঁদের মধ্যে যে আকর্ষণ ছিল সে কেবল বন্ধুত্ব বললে সম্পূর্ণ বলা হয় না | পরস্পরের মধ্যে একটি গভীর অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ ছিল | কথাবার্তা গল্প করার মধ্যে ভাব-বিনিময়ের চেষ্টা যেন সর্বদাই চলত | নতুন গল্পের প্লট বা যে প্রবন্ধ লিখছেন তার বিষয়বস্তু নিয়ে বাবা আলোচনা করতেন | জগদীশচন্দ্র তাঁর উদ্ভাবিত নতুন যন্ত্রের কথা বলতেন, নতুবা বলতেন জড় ও জীবের মধ্যে কি সব অদ্ভুত মিল তিনি সেই যন্ত্রের সাহায্যে আবিষ্কার করেছেন | দুজনের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চললেও তাঁরা যেন যথেষ্ট খোরাক পেতেন পরস্পরের কথাবার্তা আলোচনা থেকে |’
(পিতৃস্মৃতি / রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর / জিজ্ঞাসা, কলকাতা / ১৩৬৭)
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের পত্রবিনিময় হতো প্রায়ই সময় | ১০ মে, ১৯০১ লন্ডনের Royal Institution-এ জগদীশচন্দ্র ‘The Response of Inorganic Matter to Mechanical and Electric Stimulus’ বিষয়ে যে বক্তৃতা করেন ও তার ফলে বৈজ্ঞানিক মহলে যে আলোড়ন উপস্থিত হয় আর সেই কারণে ১৭ মে জগদীশচন্দ্র ও তাঁর পত্নী অবলা বসু যে দুটি পত্র রবীন্দ্রনাথকে লেখেন তার উত্তরে ১৯০১ সালের ৪ জুন (২১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৮) রবীন্দ্রনাথ লেখেন:
বন্ধু,
ধন্যোহং কৃতকৃত্যোহং! তোমাদের চিঠি পাইয়া আমি প্রাতঃকাল হইতে নূতন লোকে বিচরণ করিতেছি | যে ঈশ্বর তোমার দ্বারা ভারতের লজ্জা নিবারণ করিয়াছেন আমি তাঁহার চরণে আমার হৃদয়কে অবনত করিয়া রাখিয়াছি | কোন্ দিক্ দিয়া তিনি আমাদের দেশকে গৌরবান্বিত করিবেন অদ্য আমি তাহার অরুণাভামণ্ডিত পথ দেখিতেছি | তোমার নিকট পূজা প্রেরণ করিবার জন্য আমার অন্তঃকরণ উন্মুখ হইয়া আছে—বন্ধু, আমার পূজা গ্রহণ কর! তোমার জয় হউক্ | তোমাতে আমাদের দেশ জয়ী হউক্! নব্য ভারতের প্রথম ঋষিরূপে জ্ঞানের আলোকশিখায় নূতন হোমাগ্নি প্রজ্জ্বলিত কর |
তোমাকে বারম্বার মিনতি করিতেছি—অসময়ে ভারতবর্ষে আসিবার চেষ্টা করিও না | তুমি তোমার তপস্যা শেষ কর—দৈত্যের সহিত লড়াই করিয়া অশোকবন হইতে সীতা-উদ্ধার তুমিই করিবে, আমি যদি কিঞ্চিৎ টাকা আহরণ করিয়া সেতু বাঁধিয়া দিতে পারি তবে আমিও ফাঁকি দিয়া স্বদেশের কৃতজ্ঞতা অর্জ্জন করিব |
বেলার বিবাহের আর ১০/১১ দিন বাকি আছে | তোমার জয়সংবাদে আমার সেই উৎসব দ্বিগুণতর উৎসবময় হইয়া উঠিয়াছে | আমার সভার মধ্যে তুমি তোমার অদৃশ্য কিরণের আলোক জ্বালিয়া দিয়াছ | অনেক ঝঞ্ঝাটের মধ্যে পড়িয়াছিলাম—আমি সমস্তই ভুলিয়া গিয়াছি | আমার একান্ত দুঃখ রহিল তোমার জয়ক্ষেত্রে আমি উপস্থিত থাকিতে এবং তোমার জয়লাভের পরে তোমার হস্তস্পর্শ করিতে পারিলাম না |
তোমার ক্ষুদ্র বন্ধু মীরাকে তোমার জয়সংবাদ দিলাম, সে কিছুই বুঝিল না | যখন বুঝিবার বয়স হইবে তখন স্মরণ করিয়া খুসী হইবে |
এইবার বিবাহের আয়োজনে মন দেইগে |  ইতি—
২১শে জ্যৈষ্ঠ | (১৩০৮)
তোমার
শ্রীরবীন্দ্রনাথ
(চিঠিপত্র / ষষ্ঠ খণ্ড / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / বিশ্বভারতী / ১৯৫৭)
রবীন্দ্র কন্যা বেলা-র বিবাহে জগদীশচন্দ্র উপস্থিত থাকতে পারেননি, কিন্তু, বেলার জন্য উপহার হিসেবে ‘Joan of Arc’ (1412-1431) এর জীবনীগ্রন্থ পাঠিয়ে দেন |  রবীন্দ্রনাথ লেখেন:
‘বন্ধু,
আমার কন্যার প্রতি তোমার আশীর্ব্বাদসহ সুন্দর উপহারখানি পাইয়া আনন্দলাভ করিলাম | তোমার হস্তাক্ষরসহ এই গ্রন্থখানি বেলা উপযুক্ত আদর করিয়া পড়িবে ও রাখিবে সন্দেহ নাই | আমার জামাতাটি মনের মত হইয়াছে | সাধারণ বাঙালির ছেলের মত নয় | ঋজুস্বভাব, বিনয়ী অথচ দৃঢ়চরিত্র, পড়াশুনা ও বুদ্ধিচর্চ্চায় অসামান্যতা আছে—আর একটি মহদ্‌গুণ এই দেখিলাম, বেলাকে তাহার ভাল লাগিয়াছে | এইবার শিলাইদহ হইতে ফিরিয়া গিয়া বেলাকে মজঃফরপুরে তাহার স্বামীগৃহে পৌঁছাইয়া দিয়া আসিতে হইবে |...’
তোমার
শ্রীরবীন্দ্রনাথ
(চিঠিপত্র / ষষ্ঠ খণ্ড / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / বিশ্বভারতী / ১৯৫৭)
১৮৯৮ সালে (১৩০৪) ভগিনী নিবেদিতা ভারতে পদার্পণ করে নানান সামাজিক কর্মসূচির সাথে যুক্ত হওয়া সহ আর যে কাজ করেছিলেন তা হল ব্রাহ্ম পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও ব্রাহ্ম সমাজে নিয়মিত যাতায়াত করা | এই সুবাদে জগদীশচন্দ্র বসুর পরিবারের সাথেও নিবেদিতার গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয় | জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান প্রতিভায় তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন | সময় পেলেই তিনি জগদীশচন্দ্রের বাসভবনে চলে যেতেন ও সেখানে সান্ধ্য-আড্ডায় ও সান্ধ্য-ভোজনে অংশ নিতেন | লন্ডনে অবস্থানকালে জগদীশচন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়েন | ১২ ডিসেম্বর, ১৯০০ (২৭ পৌষ, ১৩০৭) লন্ডনে জগদীশচন্দ্রের পেটে অস্ত্রোপচার করতে হয় | আর সেই সময় অসুস্থ জগদীশচন্দ্রকে নিজের হাতে সেবা-শুশ্রূষা করেছেন নিবেদিতা |
অস্ত্রোপচারের পর স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য জগদীশচন্দ্রকে নিবেদিতা তাঁর মায়ের বাড়ি উইম্বল্‌ডনে  নিয়ে গেছেন | সেখানে মায়ের খাওয়ার ঘরকে বিজ্ঞানাগার বানিয়ে জগদীশচন্দ্র যাতে তাঁর গবেষণা চালিয়ে যেতে পারেন তার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন | জগদীশচন্দ্রের অনুরোধে নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ১৯০০ সালের নভেম্বর মাসে, যেটি ‘The Modern Review’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালের জানুয়ারি মাসে | ‘ম্যাক্‌মিলন’ প্রকাশিত ‘The Hungry Stones and Other Stories’ সংকলনে ১৯১৬ সালে এই অনুবাদ সংকলিত | ‘কাবুলিওয়ালা’ ছাড়াও নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের আরো দু’টি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন ‘ছুটি’ ও ‘দান প্রতিদান’ |
১৯০১ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ জুন রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতার (১৮৮৬-১৯১৮) সহিত বিবাহ হয় কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর (১৮৩৫-১৮৯৪) পুত্র শরৎচন্দ্রের সহিত | বিবাহের ব্যবস্থা করেন প্রিয়নাথ সেন (১৮৫৪-১৯১৬) | ১৫ জুলাই মাধুরীলতাকে স্বামীগৃহে স্থিত করার জন্য মজঃফরপুর গমন করেন | ১ শ্রাবণ কবিকে স্থানীয় বাঙালীদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন ও মানপত্র প্রদান করা হয় | ২২ জুলাইয়ের পূর্বে কবে শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তন করেন | এই সময় শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ প্রতিষ্ঠার কথা কবি ভাবতে শুরু করেন | বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভাবনা প্রথমে পত্রযোগে জানালেন বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে | ২৫ জুলাই ১৯০১ তিনি জগদীশচন্দ্রকে লেখেনঃ
বন্ধু,
তোমার কৰ্ম্ম কেন সম্পূর্ণ সফল না হইবে? বাধা যতই গুরুতর হউক তুমি যে-ভার গ্রহণ করিয়াছ তাহা সমাধা না করিয়া তোমার নিষ্কৃতি নাই; সেজন্য যে কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার প্রয়োজন তাহা তোমাকে করিতে হইবে | একথা তোমাকে ছাড়া আর কাহাকেও অসঙ্কোচে বলিতে পারিতাম না | বলিতে পারিতাম না যে, দারিদ্র্য, অর্থসঙ্কট, সাংসারিক অবনতি গ্রহণ কর | আমি নিজে হইলে হয়ত পারিতাম না—কিন্তু তোমাকে আমি নিজের চেয়ে বড় দেখি বলিয়াই তোমার কাছে দাবীর সীমা নাই | তুমি যাহা আবিষ্কার করিতেছ ও করিবে তাহাতে জগতের যে-শিক্ষা লাভ হইবে, কর্ত্তব্যের অনুরোধে যে-দুঃখভার গ্রহণ করিবে তাহাতে তাহার চেয়ে কম শিক্ষা দিবে না | আমাদের মত বিষয়পরায়ণ সাবধানী, নিষ্ঠাবিহীন, ক্ষুদ্র লোকদের পক্ষে এই দৃষ্টাস্ত, এই শিক্ষা একান্তই আবশ্যক হইয়াছে | ... .... ... তুমি যদি ফার্লো না পাও তবে একবার এখানে আসিয়ো | যথাসাধ্য ভাল বন্দোবস্ত করিয়া একেবারে যাত্রা করিয়া রণক্ষেত্রে বাহির হইবে | ইহা ছাড়া আর কি পরামর্শ দিতে পারি? একবার দেখা পাইলে বড় আনন্দিত হইব—না যদি পাই, তবু, তুমি তোমার কার্য্যে অগ্রসর হইতে পারিতেছ এই খবর পাইলে আর কিছুই চাই না  | তোমার উপরে আমার একান্ত নির্ভর আছে—বর্ত্তমান য়ুরোপ তোমাকে গ্রহণ করিল কি না তাহা লইয়া আমি অতিমাত্র উৎকণ্ঠিত হইতেছি না—তুমি যাহা দেখিতে পাইয়াছ তাহা বৈজ্ঞানিক মায়া-মরীচিকা নহে তাহাতে আমার সন্দেহমাত্র, দ্বিধামাত্র নাই ৷ তোমার উদ্ভাবিত সত্য একদিন বৈজ্ঞানিক সিংহাসনে অভিষিক্ত হইবে—সেদিনের জন্য ধৈর্য্য ধরিয়া অপেক্ষা করিতে পারিব |
ইতিমধ্যে তুমি একবার জার্ম্মানি বা আমেরিকায় যাইতে পারিলে বেশ হইত | এবারে না হয় আর একবার চেষ্টা দেখিতে হইবে |
কন্যাকে ইতিমধ্যে স্বামীগৃহে রাখিয়া আসিলাম | পথের মধ্যে কিছুদিন শাস্তিনিকেতনে বাস করিয়া আরাম লাভ করিয়াছি৷ সেখানে একটা নিৰ্জ্জন অধ্যাপনের ব্যবস্থা করিবার চেষ্টায় আছি | দুই একজন ত্যাগ-স্বীকারী ব্রহ্মচারী অধ্যাপকের সন্ধানে ফিরিতেছি |
তোমার রবি
(চিঠিপত্র / ষষ্ঠ খণ্ড / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / বিশ্বভারতী / ১৯৫৭)
১৯০১  খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্য আশ্রমের সূচনা |
১৯ ডিসেম্বর ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় (১৮৬১-১৯০৭), রেবাচাঁদ, কলকাতা থেকে সংগৃহীত ছাত্রেরা ও কিছু অতিথি-অভ্যাগত শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছে যান | সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪২-১৯২৩), সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২-১৯৩৫) প্রভৃতি ঠাকুরবাড়ির সদস্যগণও এসে পৌঁছান | রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করলেন | উপদেশ দিলেন ‘শ্রেয়ান্‌ বস্যসোঽসানি স্বাহা’ | অর্থাৎ ‘আমি যেন ধনীর থেকেও শ্রেষ্ঠতর হই’ | ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম পাঁচ-ছাত্র হলেন, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮৮-১৯৬১), গৌরগোবিন্দ গুপ্ত, প্রেমকুমার গুপ্ত, অশোককুমার গুপ্ত ও সুধীরচন্দ্র নান | সূচনালগ্নে যাঁরা শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাঁরা হলেন রেবাচাঁদ ও শিবধন বিদ্যার্ণব | অগ্রহায়ণের গোড়াতেই জগদানন্দ রায় (১৮৬৯-১৯৩৩)-কে পূর্ববঙ্গের জমিদারী সেরেস্তা থেকে তুলে এনে গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষকতায় নিযুক্ত করেন রবীন্দ্রনাথ | ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার দিন খরচ হয়েছিল, তিন হাজার ষাট টাকা আট আনা |
ইউরোপে বিজ্ঞান-জয়যাত্রা সমাপ্ত করে সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র বোম্বাই পৌঁছান ১৯০২ সালের ১১ অক্টোবর (২৫ আশ্বিন) | দীর্ঘ দু-বছরের ব্যবধানের পর দুই বন্ধু আবার মিলিত হলেন | বিজ্ঞান-সাধক এখন বিশ্ববন্দিত, আর সাহিত্য-সাধকের খ্যাতি তখন দেশ থেকে দেশান্তরে | ১২ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ, মহাসমারোহে জগদীশচন্দ্র বসু-কে অভ্যর্থনা জানালেন | এই সংবর্ধনা উপলক্ষ্যে কবি রচনা করেন যে গানঃ
জয় তব হোক জয় |
স্বদেশের গলে দাও তুমি তুলে যশোমালা অক্ষয় |
বহুদিন হতে ভারতের বাণী   আছিল নীরবে অপমান মানি,
তুমি তারে আজি জাগায়ে তুলিয়া রটালে বিশ্বময় |
জ্ঞানমন্দিরে জ্বালায়েছ তুমি যে নব আলোকশিখা
তোমার সকল ভ্রাতার ললাটে দিল উজ্জ্বল টিকা |
অবারিতগতি তব জয়রথ    ফিরে যেন আজি সকল জগৎ,
দুঃখ দীনতা যা আছে মোদের তোমারে বাঁধি না রয় ॥
(ভারতী পত্রিকার ফাল্গুন ১৩০৯ সংখ্যায় ‘বন্দনা’ শিরোনামে প্রকাশিত | ১৩০৯ সালের ১৯ মাঘ ভারতীয় সঙ্গীতসমাজ কর্তৃক আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসুর সংবর্ধনা উপলক্ষ্যে রচিত)
আর, এই বছর ২৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ হারালেন তাঁর পত্নী মৃণালিনী দেবীকে (১৮৭২-১৯০২) | ৮ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ নাবালক দুই পুত্র ও এক কন্যাকে (এক কন্যা বিবাহিতা) নিয়ে শান্তিনিকেতনে পৌঁছন | এবার তাঁর পুত্র কন্যার দায়িত্ব ন্যস্ত করলেন পিসীমা রাজলক্ষ্মী দেবীর ওপর | হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৭-১৯৫৯) লিখছেনঃ
‘মৃণালিনী দেবী যখন শয্যাগত, সেই সময়ে তাঁহার পিসীমার সপত্নী রাজলক্ষ্মী দেবী তাঁহাকে দেখিতে কলিকাতায় আসিয়াছিলেন | সপত্নী হইলেও মৃণালিনী দেবীর প্রতি আপন পিসীমার মতই তাঁহার অকৃত্রিম স্নেহ ছিল | সেই সময় ভাইঝি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন—“পিসীমা, আমি শয্যাগত, ছেলেমেয়েদের বড় কষ্ট হচ্ছে | তাদের দেখাশুনা করার কেউ নেই, তাদের ভার নিলে নিশ্চিন্ত হইতে পারি |” পিসীমা ভাইঝির কথা রক্ষা করিয়াছিলেন, সেই দিন হইতেই তিনি সংসারে থাকিয়া শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন | শান্তিনিকেতনে কবির নূতন বাড়ীতে সংসারের ভার লইয়া তিনি শিশুদের প্রতিপালন করিয়াছেন, দেখিয়াছি  | মীরা ও শমী তখন শিশু |’
(কবির কথা / হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় / ১৩৬১)
১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধগয়া যাত্রা করেনঃ
‘যাত্রার প্রাক্কালে সম্ভবত ২০ আশ্বিন (বৃহ ৬ অক্টোবর) গগনেন্দ্রনাথের গৃহে যাত্রীদলের অনেকে ও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি একটি চা-পানসভায় মিলিত হন | ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলের একজন ছাত্র শীতলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অশিক্ষিতপটুত্ব দিয়ে মর্মরপ্রস্তরে একটি লক্ষ্মীমূর্তি প্রস্তুত করেন, দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর গুণগ্রাহী হয়ে বহু ধনী ব্যক্তির সঙ্গে ভাস্করের পরিচয় করিয়ে দেন | লক্ষ্মীমূর্তিটির প্রদর্শন এই চা-পানসভার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল | দীনেশচন্দ্র লিখেছেনঃ ‘কিছুদিন হইল শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের গৃহে টী-পার্টিতে কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন | তন্মধ্যে ডাক্তার জগদীশচন্দ্র বসু, শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্টেটসম্যান সম্পাদক র্যাটক্লিফ সাহেব, সিষ্টার নিবেদিতা, সিষ্টার ক্রিষ্টিন প্রভৃতি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের নিকট লক্ষ্মীমূর্তিটি উপস্থিত করা হইয়াছিল | তাঁহাদের সকলেই নবীন ভাস্করের অশিক্ষিত পটুতা লক্ষ্য করিয়া বিশেষ প্রীতি প্রকাশ করিয়াছিলেন |’
(মর্ম্মর প্রস্তরে লক্ষী মূর্ত্তি / প্রবাসী / কার্তিক)
৭ অক্টোবর নিবেদিতা দীনেশচন্দ্রকে লেখেনঃ
‘In my opinion the marble statuette which you shewed us yesterday is full of promise and power. I had not expected anything half so good. For a first attempt we thought it quite remarkable.... Mr. Abanindranath Tagore promised me yesterday that he would give your friend the benefit of his own experience and advice and I know that Mr. Havell would be glad to do the same. As for myself I need hardly speak.’
(মর্ম্মর প্রস্তরে লক্ষী মূর্ত্তি / প্রবাসী / কার্তিক)
রথীন্দ্রনাথ তাঁর ডায়েরিতে এই ভ্রমণের বিবরণ লিখে রেখে গেছেনঃ
‘অন্ধকারের ভিতর বুদ্ধের মূর্ত্তিটা ভারি impressive বলে মনে হল | বুদ্ধের সেই শান্ত তপোমূৰ্ত্তি মনকে অভিভূত করে দেয় | আমরা সব দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় একটি জাপানী একটি সাদা থান জড়িয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসল | পালিতে মন্ত্র পড়তে আরম্ভ করল | জাপানীকে সেরকম ভাবে দেখে ভারি আশ্চর্য্য লাগল | কোথায় সেই জাপান, সেখান থেকে একটি fisherman এসে এখানে থেকে সন্ধে সকাল বুদ্ধের আরাধনা করছে |’
পরবর্তীকালে রথীন্দ্রনাথ বিস্তৃতভাবে বুদ্ধগয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করেছেনঃ
‘তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে, মন্দিরের গায়ে গবাক্ষগুলিতে প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হয়েছে | চার দিকে নিস্তব্ধ; তার মধ্যে কানে এল ‘ওঁ মণিপদ্মে হুং’—বৌদ্ধমন্ত্রের মৃদুগম্ভীর ধ্বনির আবর্তন | কয়েকটি জাপানি তীর্থযাত্রী এই মন্ত্র আবৃত্তি করতে করতে মন্দির প্রদক্ষিণ করছেন; আর প্রতি পদক্ষেপে একটি করে ধূপ জ্বেলে রেখে দিয়ে যাচ্ছেন | কী শান্ত তাঁদের মূর্তি | কী গভীর তাঁদের ভক্তি | ইষ্টপূজার কী অনাড়ম্বর প্রণালী | অনতিপূর্বে মন্দিরের ভিতরে বুদ্ধমূর্তির সামনে মোহান্তের পুরোহিতদের কর্কশ ঢাক ঢোল বাজিয়ে আরতি দেখে এসেছিলুম | আমাদের মনে এই কথাটাই জাগল, ভগবান এঁদের মধ্যে কার পূজা খুশি হয়ে গ্রহণ করলেন? মন্দিরের পরিবেশ ছেড়ে কারো আর উঠতে ইচ্ছা হয় না | অনেক রাত পর্যন্ত জগদীশচন্দ্র, ভগিনী নিবেদিতা ও পিতৃদেব বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ ইতিহাস নিয়ে নিবিষ্ট মনে আলোচনা করতেন | নিবেদিতা এক-একটি তর্ক তোলেন আর রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেন তার যথাযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে | আমরা অন্যেরা তাঁদের প্রশ্নোত্তর তর্ক-বিতর্ক মুগ্ধ হয়ে শুনে যাই | আমার বিশ্বাস, এই বুদ্ধগয়া-সন্দর্শনের ফলে উত্তরকালে বৌদ্ধ ধর্ম ও সাহিত্যে পিতৃদেবের অন্তরের আকর্ষণ প্রগাঢ় গভীর হয়ে উঠেছিল | শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে আমাকে তিনি ‘ধম্মপদ’ আগাগোড়া মুখস্থ করতে দিয়েছিলেন | পালি পড়াও শুরু হল এবং পিতারই আদেশক্রমে অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ তর্জমার দুঃসাহসে প্রবৃত্ত হলুম |’
(পিতৃস্মৃতি / রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর / জিজ্ঞাসা, কলকাতা / ১৩৬৭)
১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর শান্তিনিকেতনে পৌঁছায় | বিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র সহ সকলেই এই সংবাদে আত্মহারা হয়ে পড়েন | সমকালীন ছাত্র প্রমথনাথ বিশী লিখেছেনঃ
‘লক্ষ্য করিলাম, অজিতবাবুর চলাফেরা প্রায় নৃত্যের তালে পরিণত হইয়াছে | ...তারপর ক্ষিতিমোহনবাবু প্রবেশ করিলেন | স্বভাবত তিনি গম্ভীরপ্রকৃতির লোক, চলাফেরায় সংযত, কিন্তু তাঁহাকেও চঞ্চল দেখিলাম |’
(রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন / প্রমথনাথ বিশী / বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ / ১৩৫১)
‘আশ্রম কথা’-য় লিখিত হয়েছেঃ
‘আশ্রমের আচার্য্য পূজনীয় রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে চার দিন... বিদ্যালয়ের কাজ বন্ধ ছিল |’
(তত্ত্ববোধিনী)
এরপর কয়েকদিন ধরে বোলপুর টেলিগ্রাম অফিসকে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় | রবীন্দ্রনাথকে
অভিনন্দন
জানিয়ে দেশ ও বিদেশ থেকে অজস্র টেলিগ্রাম আসতে থাকে | চিঠিও অসংখ্য | সমস্ত চিঠির উত্তর স্বহস্তে দেওয়া রবীন্দ্রনাথ কর্তব্য বিবেচনা করতেন | কিন্তু এখন সেই কর্তব্যপালন তাঁর সাধ্যাতীত হয়ে দাঁড়াল | তাঁর লিখিত বয়ান সাইক্লোস্টাইল করা হল | ‘আমার সম্মানলাভে যাঁহারা আনন্দ প্রকাশ করিতেছেন তাঁহাদের প্রতি আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা নিবেদন করিতেছি | ইতি ১লা অগ্রহায়ণ ১৩২০ |’
(দেশ / ১৮ ফাল্গুন, ১৩৯১)
রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরে লিখিত এই বয়ানের সাইক্লোস্টাইল যন্ত্রে মুদ্রিত প্রতিলিপি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠানো হয় | তা সত্ত্বেও বিশিষ্ট কিছু বন্ধুর চিঠির উত্তর তিনি আলাদা করেই দিয়েছেন | উক্ত তারিখেই রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে রবীন্দ্রনাথ লেখেনঃ
‘সম্মানের ভূতে আমাকে পাইয়াছে, আমি মনে মনে ওঝা ডাকিতেছি—আপনাদের আনন্দে আমি সম্পূর্ণ যোগ দিতে পারিতেছি না | আপনি হয়ত ভাবিবেন এটা আমার অত্যুক্তি হইল কিন্তু অন্তর্যামী জানেন আমার জীবন কিরূপ ভারাতুর হইয়া উঠিয়াছে |
“কোলাহল ত বারণ হল / এবার কথা কানে কানে”—
এই কবিতাটি দিয়া আমি গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জ্জমা শুরু করিয়াছিলাম | কারণটা যে কত দূর সফল হইল তাহা দেখিতেই পাইতেছেন |’
(দেশ, সাহিত্য, ১৩৮৫ / ১৯, পত্র ৩৩)
রোটেনস্টাইন (William Rothenstein, 1872-1945)
অভিনন্দন
জানিয়ে টেলিগ্রাম ও চিঠি পাঠান | রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রামের উত্তরে ১৮ নভেম্বর, ১৯১৩ (মঙ্গল ২ অগ্র) তাঁকে লেখেনঃ
‘The very first moment I received the message of the great honour conferred on me by the award of the Nobel prize my heart turned towards you with love and gratitude. I felt certain that of all my friends none would be more glad at this news than you. But, all the same, it is a very great trial for me. The perfect whirlwind of public excitement it has given rise to is frightful. It is almost as bad as tying a tin can at a dog’s tail making it impossible for him to move without creating noise and collecting crowds all along. I am being smothered with telegrams and letters for the last few days and the people who never read a line of my works are loudest in their protestations of joy’.
(Imperfect Encounter–Letters of William Rothenstein & Rabindranath Tagore 1911–1941 / Harvard University Press, 1974)
এই উপলক্ষ্যে সম্পাদক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রস্তাবে ও সভাপতি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অনুমোদনে ৫ অগ্র (শুক্র, ২১ নভেম্বর) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কার্যনির্বাহক সমিতির একটি বিশেষ অধিবেশন আহূত হয় | এখানে গৃহীত প্রস্তাবগুলি সম্বন্ধে কার্যবিবরণী পুস্তকে লেখা হয়ঃ
১ | রামেন্দ্র বাবুর পত্র পঠিত হইল এবং স্থির হইল যে, Swedish Academyকে ধন্যবাদসূচক পত্র দেওয়ার প্রস্তাব করা প্রয়োজন |
২ | রামেন্দ্র বাবুর প্রস্তাব অনুমোদন পূর্ব্বক সভাপতি মহাশয় নিম্নলিখিত টেলিগ্রাম রবীন্দ্রবাবুর নিকট পাঠাইয়া দিলেনঃ
‘Hearty Congratulation on the Triumph of Rabindranath and the recognition of the Bengali literature through him by European nations. A deputation of the Bangiya Sahitya Parishad will reach Bolpur on Sunday’.
—Shastri
এ সম্বন্ধে বহু বাদানুবাদের পর স্থির হইল যে, রবীন্দ্রনাথকে উপযুক্তরূপে সম্বর্থনা করা উচিত এবং রবিবারে যে ডেপুটেশন বা প্রতিনিধিবর্গ যাইবেন, তাঁহারা উক্ত সম্বর্দ্ধনা উপলক্ষ্যে পরিষদের পক্ষ হইতে রবীন্দ্রনাথকে নিমন্ত্রণ করিয়া আসিবেন |
৩ | সভাপতি মহাশয় প্রস্তাব করিয়াছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথকে সোনার দোয়াত ও কলম উপহার দেওয়া হউক | এ সম্বন্ধে স্থির হইল যে, কি ভাবে সম্বর্দ্ধনা করিতে হইবে, বিবেচনা করিবার সময় উহার বিচার করা যাইবে  |
৪ | অতঃপর নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলি গৃহীত হইলঃ
(ক) “যাঁহার গৌরবে আজি বঙ্গদেশ গৌরবান্বিত, যাঁহার প্রভায় আজি বঙ্গ-সাহিত্য প্রভান্বিত, যাঁহার রচনা অবলম্বনে বাঙ্গালা সাহিত্য জগতের সাহিত্য মধ্যে উন্নত আসন অধিকার করিয়াছে, যাঁহার সম্মানে ভারতবর্ষে আনন্দের স্রোত বহিয়াছে, বাঙ্গালা সাহিত্য-সমাজের মুখপাত্রস্বরূপে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ সেই আনন্দে সর্ব্বান্তঃকরণে যোগ দিতেছেন |”
(খ) “সুইডিস্ একাডেমী ডাক্তার রবীন্দ্রনাথের রচনা পাঠান্তে বঙ্গীয়-সাহিত্যের প্রতি সম্ভ্রমবুদ্ধি প্রকাশ করিয়া ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়কে এবৎসর বিদ্বৎসমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানকর পারিতোষিক “নোবেল প্রাইজ” দান করিয়া বাঙ্গালী সাহিত্যিকবর্গের ধন্যবাদভাজন হইয়াছেন | সমগ্র বঙ্গের সাহিত্য-সমাজের মুখপাত্রস্বরূপ বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ সুইডিস্ একাডেমীকে সেই জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছেন |”
(গ) “পরিষদের চিরবন্ধু ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে তাঁহাকে উপযুক্তরূপে সম্বৰ্দ্ধনা করিবার জন্য ব্যবস্থা করা হউক |”
(ঘ) ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়কে এই সম্বৰ্দ্ধনা উপলক্ষ্যে বোলপুরে নিমন্ত্রণ করিবার নিমিত্ত বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের পক্ষ হইতে নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণকে নিযুক্ত করা হউক |”
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আশুতোষ চৌধুরী, সারদাচরণ মিত্র, যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলেশচন্দ্র মজুমদার, মন্মথমোহন বসু, কবিরাজ দুর্গানারায়ণ সেনশাস্ত্রী ও ব্যোমকেশ মুস্তফী |
শান্তিনিকেতনেও রবীন্দ্র-সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় | সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন কবি-বন্ধু, জগদীশচন্দ্র বসু |
ক্ষিতিমোহন, দিনেন্দ্রনাথ ও কয়েকজন ছাত্র বেদমন্ত্র পাঠ ও গান করে অতিথিদের অভ্যর্থনা করলেন  | আশুতোষ চৌধুরীর প্রস্তাবে ও ভূপেন্দ্রনাথ বসুর সমর্থনে জগদীশচন্দ্র বসু সভাপতি-পদে বৃত হলেন | সভাস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন প্রতিনিধি মনোনীত হয়ে রবীন্দ্রনাথকে সভায় আহ্বান করে আনতে গেলেন | ইতিমধ্যে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত
অভিনন্দন
পত্রটি পাঠ করে সকলকে শোনালেন | পট্টবস্ত্রাবৃত চন্দনচর্চিত রবীন্দ্রনাথ সভাস্থলে এলে শঙ্খধ্বনি ও মহিলাদের পরমেশ-বন্দনার মধ্যে সভাপতি জগদীশচন্দ্র তাঁকে মাল্যভূষিত করেন | সংগীতের পর হীরেন্দ্রনাথ রেশমী কাপড়ে মুদ্রিত অভিনন্দনটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথকে অর্পণ করলেনঃ
‘যাঁহার কাব্যবীণায় বিকাশোন্মুখ শিশু-হৃদয়ের প্রভাতী কাকলী হইতে অধ্যাত্ম-রাগ-রঞ্জিত পৌঢ়-বৈরাগ্যের বৈকালী সুর পর্যন্ত নিখিল রাগিণী নিঃশেষে ধ্বনিত হইয়াছে, যাঁহার নব-নব-উন্মেষ-শালিনী প্রতিভার অজস্র কিরণসম্পাতে বঙ্গীয় নরনারীর দৈনন্দিন জীবন আজ সমুজ্জ্বল, যিনি বিশেষ ভাবে বাঙালীর জাতীয় কবি হইয়াও সার্ব্বভৌমিক গুণিগণের গণনায় জগতের কবি সভায় সম্মানের মহোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন, সেই ভাব ও জ্ঞান রাজ্যের বর্ত্তমান সম্রাট ধ্যানরসিক স্বদেশের প্রিয়তম কবি/শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয়কে/বঙ্গের আবালবৃদ্ধবনিতা শ্রদ্ধার স্রক্‌চন্দনে/ অভিনন্দিত করিতেছে |/ ৭ই অগ্রহায়ণ ১৩২০ বঙ্গাব্দ |’
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর ড. জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিনে ‘বসু-বিজ্ঞান মন্দির’-এর উদ্বোধন হলো | তাঁর জীবনের সকল সঞ্চয় ও অনেকের দানে জগদীশচন্দ্র এই গবেষণাগার নির্মাণ করেন | উদ্বোধনের বিবরণ পাওয়া যায় ১ ডিসেম্বর ১৯১৭ ‘The Amrit Bazar Patrika’-তে |
‘... The proceedings opened with the singing of a Vedic song followed by the recital of invocation “stotras” in Sanskrit. Some of the senior students approached Dr. Bose and after garlanding him begged his blessings. Dr. Bose blessed them all after which Dr. Bose read his speech as follows.’
রবীন্দ্রনাথ এই উপলক্ষ্যে রচনা করেনঃ
মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর’ মহোজ্জ্বল আজ হে
বর      পুত্রসঙ্ঘ বিরাজ’ হে |
শুভ     শঙ্খ বাজহ বাজ’ হে |
ঘন      তিমিররাত্রির চির প্রতীক্ষা
পূর্ণ কর’, লহ’ জ্যোতিদীক্ষা,
যাত্রীদল সব সাজ’ হে |
শুভ     শঙ্খ বাজহ বাজ’ হে |
বল      জয় নরোত্তম, পুরুষসত্তম,
জয় তপস্বিরাজ হে |
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় হে |
এস’     বজ্রমহাসনে মাতৃ-আশীর্ভাষণে,
সকল সাধক এস’ হে,   ধন্য কর’ এ দেশ হে |
সকল যোগী, সকল ত্যাগী, এস’ দুঃসহদুঃখভাগী—
এস’ দুর্জয়শক্তিসম্পদ মুক্তবন্ধ সমাজ হে |
এস’ জ্ঞানী, এস’ কর্মী নাশ’ ভারতলাজ হে |
এস’ মঙ্গল, এস’ গৌরব,
এস’ অক্ষয়পুণ্যসৌরভ,
এস’ তেজঃসূর্য উজ্জ্বল কীর্তি-অম্বর মাঝ হে
বীরধর্মে পুণ্যকর্মে বিশ্বহৃদয়ে রাজ’ হে |
শুভ     শঙ্খ বাজহ বাজ’ হে |
জয়      জয় নরোত্তম, পুরুষসত্তম,
জয় তপস্বিরাজ হে |
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় হে॥
(জগদীশচন্দ্রের ‘বসু-বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা দিবস ১৪ অগ্রহায়ণ, ১৩২৪ উপলক্ষ্যে রচিত)
রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর সঙ্গে প্রথম থেকে যুক্ত থেকেছেন জগদীশচন্দ্র বসু | বিশ্বভারতীর সকল কাজে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন তিনি | ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দের ১৬মে (১৩২৯ বঙ্গাব্দ, ২ জ্যৈষ্ঠ) বিশ্বভারতীর সংবিধান ACT XXI of 1860 অনুসারে রেজিস্ট্রি হয় | গঠিত হয় পরিষৎ, সংসদ (Governing Body), ন্যাসিক সভা Board of Trustees), কর্মসমিতি (Executive Committee), শিক্ষাসমিতি (Academic Council), অধ্যাপকমগুলি, নারী সমিতি, সুরুল সমিতি (Surul Agricultural Board), স্থানিক সভা (Recognised Local Bodies) এবং বিভিন্ন অনুমোদিত সঙ্ঘসমূহ নিয়ে বিশ্বভারতীর পরিচালনা পদ্ধতি গঠিত হয় | রবীন্দ্রনাথ হন প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য, তাঁর কার্যকাল আজীবন, যদি-না তিনি আগেই অবসর নিতে ইচ্ছুক হন | প্রথম অর্থসচিব (Treasurer) হন দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং যুগ্ম-কর্মসচিব রথীন্দ্রনাথ ও প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ (১৮৯৩-১৯৭২) | ‘প্রধান’ মনোনীত হন পিঠাপুরমের রাজা, জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭), ব্রজেন্দ্রনাথ শীল (১৮৬৪-১৯৩৮) ও সি. এফ. অ্যান্ডরুজ (১৮৭১-১৯৪০); প্রতিষ্ঠাতা সাম্মানিক সদস্য মাইকেল স্যাডলার (১৮৬১-১৯৪৯), সিলভ্যাঁ লেভি (১৮৬৩-১৯৩৫) এবং জাপানের এম. আনেসাকি (১৮৭৩-১৯৪৯); ন্যাসিক-সভার সদস্য রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১), দ্বিপেন্দ্রনাথ (১৮৬২-১৯২২), সুরেন্দ্রনাথ (১৮৪৮-১৯২৫), রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১), নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩), হীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৬৮-১৯৪২) ও প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬); প্রথম কর্মাধ্যক্ষরা হলেন আশ্রমসচিব জগদানন্দ রায় (১৮৬৯-১৯৩৩), সুরুলসচিব এল্‌ম্‌হার্স্ট, উত্তর বিভাগের অধিনেতা বিধুশেখর শাস্ত্রী (১৮৭৮-১৯৫৯) ও পূর্ব বিভাগের অধিনেতা সন্তোষচন্দ্র মজুমদার (১৮৮৪-১৯২৬) | প্রথম সংসদ গঠিত হয় কর্মকর্তা, প্রধান, কর্মাধ্যক্ষ এবং সাধারণ সদস্য গগনেন্দ্রনাথ (১৮৬৭-১৯৩৮), নেপালচন্দ্র রায় (১৮৬৭-১৯৪৪), শিশিরকুমার মৈত্র (১৯০১-১৯৭৬), সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র (১৮৮১-১৯৪৫), ফণিভূষণ অধিকারী, সুশীলকুমার রুদ্র, মহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), ক্ষিতিমোহন সেন (১৮৮০-১৯৬০), যদুনাথ সরকার (১৮৭০-১৯৫৮), সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭২-১৯৪০), মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯২৯), জে. এইচ. কাজিন্‌স্‌ (১৮৭৩-১৮৫৬), অম্বালাল সারাভাই (১৮৯০-১৯৬৭), প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮৬-১৯৬৭) ও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২-১৯৩৫), অধ্যাপকমণ্ডলির প্রতিনিধি নন্দলাল বসু (১৮৮৩-১৯৬৬), তেজেশচন্দ্র সেন (১৮৯৩-১৯৬০), সুরেন্দ্রনাথ কর (১৮৯২-১৯৭০), রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৮৫), নারীসমিতির প্রতিনিধি স্নেহলতা সেন, কিরণবালা সেন (১৮৮৯-১৯৮৩) ও হেমলতা ঠাকুর (১৮৭৪-১৯৬৭), সুরুলসমিতির প্রতিনিধি কালীমোহন ঘোষ (১৮৮২-১৯৪০) ও গৌরগোপাল ঘোষকে নিয়ে | প্রথম কর্মসমিতির সদস্যেরা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, দ্বিপেন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, অ্যান্ডরুজ, জগদানন্দ রায়, নেপালচন্দ্র রায় (১৮৬৭-১৯৪৪), ক্ষিতিমোহন সেন, এল্‌ম্‌হার্স্ট, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিধুশেখর শাস্ত্রী (১৮৭৮-১৯৫৯), সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, গৌরগোপাল ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ কর, অনিলকুমার মিত্র, স্নেহলতা সেন ও কিরণবালা সেন (১৮৮৯-১৯৮৩) | প্রথম শিক্ষাসমিতির সদস্যেরা ছিলেন ৮ জন কর্মকর্তা ও প্রধান ছাড়া জগদানন্দ রায়, এল্‌ম্‌হার্স্ট, বিধুশেখর শাস্ত্রী, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, নন্দলাল বসু, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ভীমরাও শাস্ত্রী, পিয়র্সন, মরিস, সুরেন্দ্রনাথ কর, গৌরগোপাল ঘোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৭-১৯৫৯), অনিলকুমার মিত্র, বিভূতিভূষণ গুপ্ত, ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, স্নেহলতা সেন, কিরণবালা সেন এবং সুধাময়ী মুখোপাধ্যায় | নারীসমিতির প্রথম সদস্যরা হলেন স্নেহলতা সেন, কিরণবালা সেন, প্রতিমা ঠাকুর (১৮৯৩-১৯৬৯), সুধীরা বসু, যুগলমোহিনী মজুমদার, সুধাময়ী মুখোপাধ্যায় (১৮৯৬-১৯৮২), সংজ্ঞা ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ এবং অ্যান্ডরুজ | প্রথম সুরুল সমিতির সদস্যেরা ছিলেন চার কর্মকর্তা, অ্যান্ডরুজ, এল্‌ম্‌হার্স্ট, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪২-১৯২৩), ক্ষিতিমোহন সেন, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, গৌরগোপাল ঘোষ, কালীমোহন ঘোষ এবং সুরেন্দ্রনাথ কর (১৮৯২-১৯৭০) |
জগদীশচন্দ্র বসু বিশ্ব-বিখ্যাত জীব-পদার্থবিজ্ঞানী | তিনি একইসঙ্গে পদার্থবিদ, উদ্ভিদবিদ, ও জীববিজ্ঞানী | তিনি একজন কল্পবিজ্ঞান রচয়িতাও | ‘ইনস্টিটিউট্‌ অব্‌ ইলেকট্রিক্যাল্‌ অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স্‌ ইঞ্জিনিয়ার্স’ তাঁকে ‘রেডিও বিজ্ঞানের জনক’ বলে অভিহিত করেছেন | ইওরোপে বিজ্ঞানচর্চা শুরু হবার কয়েক শতাব্দী পরেও আমাদের উপমহাদেশে বিজ্ঞানচর্চা তেমন সফলতা পায়নি | জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম বাঙালি-বিজ্ঞানী, যিনি এই উপমহাদেশে আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণায় বিপ্লব এনেছিলেন | বিশ্ববাসীর কাছে তিনি প্রমাণ করেছিলেন পরাধীন ভারতবর্ষের একজন বাঙালি, মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে | জর্জ বার্নার্ড শ’ (১৮৫৬-১৯৫০) তাঁর লেখা সমস্ত গ্রন্থ জগদীশচন্দ্রকে উপহার দিয়েছিলেন | সেই উপহারের ওপর লিখেছিলেনঃ ‘From the least to the greatest Biologist’ | রোঁম্যাঁ রোল্যাঁ (১৮৬৬-১৯৪৪) তাঁর ‘জাঁ ক্রিস্তফ’ (Jean-Christophe) বইটি জগদীশচন্দ্রকে উপহার দিয়েছিলেন এই কথা লিখেঃ ‘To the Revealer of a New World’ | বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) বলেছিলেনঃ ‘জগদীশচন্দ্র বসু যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন, তার যে কোন একটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা যেতে পারে |’
অথচ, এই প্রতিভাধর মানুষকে জীবনে লড়তে হয়েছে অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে | জীবন সংগ্রামে যখন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তেন তখন বন্ধু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সাহস যুগিয়েছেন | রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থখানি জগদীশচন্দ্রকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেনঃ
‘উৎসর্গ
সুহৃদ্‌বর শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানাচার্য
করকমলেষু
সত্য রত্ন তুমি দিলে, পরিবর্তে তার
কথা ও কল্পনামাত্র দিনু উপহার |’
শিলাইদহ
অগ্রহায়ণ, ১৩০৬
(কথা / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / ১৮৯৯)
কবির চোখে জগদীশচন্দ্র ছিলেন সত্যদ্রষ্টা এক ঋষি | তিনি লিখছেনঃ
‘ভারতের কোন্ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি
হে আচার্য জগদীশ | কী অদৃশ্য তপোভূমি
বিরচিলে এ পাষাণনগরীর শুষ্ক ধূলিতলে |...’
জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে লেখক সুধাংশু পাত্র লিখেছেনঃ
‘জগদীশচন্দ্র কেবলমাত্র বিজ্ঞানী ছিলেন না, লেখক হিসেবে তাঁর সুনাম আজও অক্ষুন্ন আছে | ‘Plant Response’, ‘Electro-Physiology’ এবং ‘The Motor Mechanism of Plants’ তাঁর তিনটি প্রখ্যাত গ্রন্থ | তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘অব্যক্ত’ বাংলা-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ |
(ভারতের বিজ্ঞান সাধক / সুধাংশু পাত্র / সুজন প্রকাশনী ১৯৮৬)
বিজ্ঞান-বিষয়ের প্রবন্ধকার শিব শংকর সেনাপতি জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে একটি গ্রন্থে লিখেছেনঃ
‘জীববিদ্যা বিভাগে জগদীশচন্দ্রের কাজ যথেষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছে | জগদীশচন্দ্র একজন পদার্থ বিজ্ঞানী হয়েও সবরকম প্রথা ভেঙ্গে নিজেকে জীববিজ্ঞানীরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন সমগ্র বিশ্বে |’
(আধুনিক জীবপদার্থবিদ্যার জনক আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু / শিব শংকর সেনাপতি / প্রতিফলন পাবলিকেশনস)
জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ
‘বিজ্ঞান ও রসসাহিত্যের প্রকোষ্ঠ সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন মহলে, কিন্তু তাদের মধ্যে যাওয়া-আসার দেনা-পাওনার পথ আছে | জগদীশ ছিলেন সেই পথের পথিক | সেই জন্যে বিজ্ঞানী ও কবির মিলনের উপকরণ দুই মহল থেকেই জুটত | আমার অনুশীলনের মধ্যে বিজ্ঞানের অংশ বেশি ছিল না, কিন্তু ছিল তা আমার প্রবৃত্তির মধ্যে | সাহিত্য সম্বন্ধে তাঁর ছিল অনুরূপ অবস্থা | সেই জন্যে আমাদের বন্ধুত্বের কক্ষে হাওয়া চলত দুই দিকের দুই খোলা জানলা দিয়ে | তাঁর কাছে আর একটা ছিল আমার মিলনের অবকাশ যেখানে ছিল তাঁর অতি নিবিড় দেশপ্রীতি |’
(চিঠিপত্র / ষষ্ঠ খণ্ড / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / বিশ্বভারতী / ১৯৫৭)
১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর জগদীশচন্দ্র বসু প্রয়াত হয়েছেন | রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৭৭ | জগদীশচন্দ্রের প্রায়াণে রবীন্দ্রনাথ শোকাহত | আশ্চর্যজনক ভাবে রবীন্দ্রনাথ তখন বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থপাঠে আরো মনোনিবেশ করছেন | ১৯৩৭-এর ১৯ এপ্রিল হেমন্তবালা দেবীকে কবি লিখছেনঃ
‘সাহিত্যের বই এর চেয়ে বিজ্ঞানের বই আমি বেশি পড়ে থাকি |...’
তখন তাঁর বিজ্ঞান-বিষয়ক গ্রন্থ ‘বিশ্বপরিচয়’ লেখা চলছে | ২ অক্টোবর, ১৯৩৭ ‘বিশ্বপরিচয়’-এর ভূমিকায় কবি লিখলেনঃ
‘বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞান চর্চার |...’
ভাবজগতের কবি  মোহমুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছেন জগদীশচন্দ্র বসুর সান্নিধ্যে, আর, বিজ্ঞান- তপস্বী জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে সাহিত্য রসে রসসিক্ত হয়ে প্রতি পরমাণু-তে গতিময়তার স্পন্দন অনুভব করছেন | ‘অব্যক্ত’-গ্রন্থে লিখছেনঃ
‘যাহা বিচ্ছিন্ন মনে করিতাম, প্রকৃতপক্ষে তাহা বিচ্ছিন্ন নহে | শূন্যে বিক্ষিপ্ত কোটি কোটি জগৎ আকাশসূত্রে গ্রথিত | এক জগতের স্পন্দন আকাশ বাহিয়া অন্য জগতে সঞ্চালিত হইতেছে |’
(অব্যক্ত / জগদীশচন্দ্র বসু / পাতাবাহার / ২০১৩)
সীমার মধ্যে অসীমের সন্ধান করেছেন রবীন্দ্রনাথ, আর অসীমের মধ্যে সীমা-কে খুঁজে পেয়েছেন জগদীশচন্দ্র | অব্যক্ত, ব্যক্ত হয়েছে জগদীশচন্দ্রের অনুভবে |
ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী
রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক || ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ || মে ২৩, ২০২১




Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content