রাজনারায়ণ বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Bengali E-Learning
Go to content

রাজনারায়ণ বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

E-Learning Bengali
রাজনারায়ণ বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উনিশ শতকে ভারতীয় নবজাগরণের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বদেশ চেতনা। স্বদেশ চেতনার প্রসারে অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল রাজনারায়ণ বসুর (১৮২৬-১৮৯৯)। সে যুগে রাজনারায়ণ বসু সম্পর্কে বলা হতো 'Grand Father of Indian Nationalism'। রাজনারায়ণ বসু ছিলেন একজন ঔপনিষদিক, ব্রহ্মবাদে বিশ্বাসী, ঋষিতুল্য মানুষ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ব্রহ্ম-এক, অদ্বিতীয় ও অনন্তস্বরূপ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে এসে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণে তিনি বেশি করে উদ্বুদ্ধ হন। ১৮৪৬ সালে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন।  ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরে ঠাকুর পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। রাজনারায়ণ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে উপনিষদের পাঠ নেন ও ঈশ, কেন, কঠ, মুন্ডক শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদ করেন, যা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রাজনারায়ণ বসু হিন্দু কলেজের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রগাঢ় পান্ডিত্য ছিলো। দেবেন্দ্রনাথ, রাজনারায়ণ-কে 'ইংরেজী খাঁ' উপাধি দিয়েছিলেন। রাজনারায়ণ বসুর কাছ থেকে ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার ও রামগতি ন্যায়রত্নের মতো সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিতগণ।
ঠাকুরবাড়ির গণেন্দ্রনাথ (১৮৪১-৬৯) যিনি গিরীন্দ্রনাথের পুত্র, নবগোপাল মিত্র (১৮৪০-১৮৯৪) ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে 'হিন্দু মেলা'র প্রথম অধিবেশন হয় ১৮৬৭ সালের চৈত্র সংক্রান্তিতে। তখন রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) বয়স মাত্র ৬। কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রকাশ ঘটে হিন্দু মেলার নবম অধিবেশনে (১১ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৫)। এই নবম অধিবেশনে পঠিত 'হিন্দুমেলার উপহার' কবিতা কবির নাম-যুক্ত প্রথম মুদ্রিত কবিতা। অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (১৮৪৯-১৯২৫) ১৮৭৬ সালে রাজনারায়ণ বসু কে সাথে নিয়ে যখন 'সঞ্জীবনী সভা' নামক গুপ্ত সমিতি তৈরি করেন, তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ১৫ ও রবীন্দ্রনাথ এই গুপ্ত সমিতিতে যুক্ত হয়ে যান। সঞ্জীবনী সভার জন্য তিনি 'এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন...' গান রচনা করেন।
কেশবচন্দ্র সেনের (১৮৩৮-১৮৮৪) দেহত্যাগের পর ব্রাহ্মসমাজে যখন  মতাদর্শগত বিরোধ তৈরি হয়, তখন রাজনারায়ণ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কথা বলেন।
রাজনারায়ণ বসু সংস্কৃত কলেজে ইংরেজিতে অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে দিয়ে  ১৮৫১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মেদিনীপুর জেলা স্কুলে (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল) প্রধান শিক্ষকতার কাজে যোগদান করেন। ১৮৬৬ সালের ৬ মার্চ পর্যন্ত ঐ স্কুলে প্রধান শিক্ষকতার কাজ করেছেন, দক্ষতার সঙ্গে। অসুস্থতার কারণে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ছাড়লেও আরো তিন বছর তিনি মেদিনীপুর শহরে কাটিয়েছেন। মেদিনীপুর শহরে অবস্থানকালে মেদিনীপুর জেলা স্কুলের উন্নতি ছাড়াও তিনি স্থাপন করেছিলেন একটি বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমানে ঋষি রাজনারায়াণ বসু বালিকা বিদ্যালয়), একটি সাধারণ পাঠাগার (বর্তমানে রাজনারায়ণ বসু স্মৃতি পাঠাগার)। এছাড়াও তৈরি করেছিলেনঃ 'সঙ্গতসভা', 'ধর্মালোচনা সভা', 'বিতর্ক সভা', 'সাহিত্য উৎসাহিনী সভা', 'সুরাপান নিবারণী সভা'। ১৮৬৪ সালে ব্রাহ্ম ধর্মের বিধান অনুসারে তাঁর কন্যা স্বর্ণলতা দেবীর সাথে বিবাহ হয় কৃষ্ণধন ঘোষের সঙ্গে। মেদিনীপুর জেলা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই বিবাহ অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেন অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, আচার্য ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। এই বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনারায়ণ বসুর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিত্বে ও পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়েছেন। দীর্ঘদিন সেই সম্পর্ক তিনি অক্ষুন্ন রেখেছেন। এমনকি ১৮৭৯ সালে রাজনারায়ণ বসু দেওঘরে বসবাসের উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ার পরও রবীন্দ্রনাথ দেওঘরে গেছেন, তাঁর সাথে দেখা করতে। রাজনারায়ণ বসু তাঁর ডায়েরীর পাতায় ১৮৮৫ সালের ১৭ আগস্ট লিখেছেনঃ "অদ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলিকাতা হইতে আইসেন তাহাতে মহা আনন্দের উদয় হয়। কল্য কি বিষাদের দিন ছিল! অদ্য কি আনন্দ! রবীন্দ্রনাথ তাঁহার রচিত কয়েকটি গীত আমাদিগকে শুনাইলেন। ইনি চমৎকার গান করেন"। রবীন্দ্রনাথ রচিত কয়েকটি গান যেমন 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...', 'সত্যমঙ্গল প্রেমময় তুমি...', 'পাদপ্রান্তে রাখ সেবকে...' রাজনারায়ণের খুব প্রিয় গান।রবীন্দ্রনাথ ও রাজনারায়ণ বসুর প্রতি ছিলেন ভীষণভাবে শ্রদ্ধাশীল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ "...একদিকে তিনি আপনার জীবন এবং সংসারটিকে ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ নিবেদন করিয়া দিয়াছিলেন, আর একদিকে দেশের উন্নতি সাধন করিবার জন্য তিনি সর্বদাই কতরকমের সাধ্য ও অসাধ্য প্ল্যান করিতেন তাহার অন্ত নাই"। ১৮৯৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজনারায়ণ বসু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছানুসারে তাঁর পুত্র-কন্যা-পৌত্র-দৌহিত্র-দৌহিত্রী মিলে রবীন্দ্রনাথ রচিত এই গানটি গেয়ে তাঁর শান্তি কামনা করেন।
"মিটিল সব ক্ষুধা,    তাঁহার প্রেমসুধা,    চলো রে ঘরে লয়ে যাই।
সেথা যে কত লোক    পেয়েছে কত শোক,    তৃষিত আছে কত ভাই।।
ডাকো রে তাঁর নামে    সবারে নিজধামে,    সকলে তাঁর গুণ গাই।
দুখি কাতর জনে    রেখো রে রেখো মনে,    হৃদয়ে সবে দেহো ঠাঁই।।
সতত চাহি তাঁরে    ভোলো রে আপনারে,    সবারে করো রে আপন।
শান্তি-আহরণে    শান্তি বিতরণে,    জীবন করো রে যাপন।
এত যে সুখ আছে    কে তাহা শুনিয়াছে !    চলো রে সবারে শুনাই।
বলো রে ডেকে বলো    ‘পিতার ঘরে চলো,    হেথায় শোকতাপ নাই’।।"
(ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক/এপ্রিল ১৬, ২০২১)




Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content