রবীন্দ্রনাথ ও ভগিনী নিবেদিতা

Bengali E-Learning
Go to content

রবীন্দ্রনাথ ও ভগিনী নিবেদিতা

E-Learning Bengali
রবীন্দ্রনাথ (৭ মে, ১৮৬১ - ৭ আগস্ট, ১৯৪১), ভগিনী নিবেদিতার (২৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ – ১৩ অক্টোবর, ১৯১১) চেয়ে ৬ বছরের বড়ো। প্রথম দর্শনেই কবির চেহারা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছেন নিবেদিতা। নিবেদিতা-র ভারত-সেবায় মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘লোকমাতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ১৮৯৫ সালের ১৩ নভেম্বর লন্ডনে লেডি ইসাবেল মর্গেসন-এর বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হন, এরপর আরো কয়েকটি বক্তৃতা শুনে, নানান প্রশ্নের সদুত্তর পেয়ে স্বামীজী-র শিষ্যত্ব গ্রহণ করার জন্য মনস্থির করেন। ইউরোপ উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাজ ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি কলকাতা বন্দরে এসে পৌঁছোলো, মার্গারেট দেখলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি, ১৮৬৩ – ৪ জুলাই, ১৯০২) তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে জেটিতে অপেক্ষা করছেন। ঐ বছর ২৫ মার্চ স্বামীজী মার্গারেট-কে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করেন ও তাঁর নামকরণ করেন ‘নিবেদিতা’, অর্থাৎ ঈশ্বরে নিবেদিত। ১৮৯৬ সালের মে মাসে প্লেগ মহামারীর রূপ নেয়। সাধারণ মানুষকে এই সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে ও আক্রান্ত রুগীদের সেবা করতে নিবেদিতা সম্পূর্ণভাবে নিজেকে যুক্ত করলেন। তাঁর এই কাজে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার এডওয়ার্ড টমসন লিখছেনঃ ‘That year (1898) plague broke out in Calcutta. She (Sister Nivedita) organised relief work, assisted by (Rabindranath) Tagore’. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ আগস্ট, ১৮৭১- ৫ ডিসেম্বর, ১৯৫১) স্মৃতিচারণ করেছেনঃ ‘সেই সময় কলকাতায় লাগল প্লেগ। চারদিকে মহামারী চলছে, ঘরে ঘরে লোক মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। রবিকাকা এবং আমরা এবাড়ির সবাই মিলে চাঁদা তুলে প্লেগ হাসপাতাল খুলেছি, চুন বিলি করেছি। রবিকাকা ও সিস্টার নিবেদিতা পাড়ায় পাড়ায় ইনস্পেকশন-এ যেতেন’।
১৮৯৮ সালের ১৩ নভেম্বর নিবেদিতা কলকাতার বাগবাজারে মেয়েদের শিক্ষার জন্য একটি স্কুল খোলেন। নারীশিক্ষার প্রসারে নিবেদিতা যে সকল কর্মসূচি গ্রহণ করেন সেগুলির সার্থক রূপায়ণে তিনি যাঁদের সহযোগিতা পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অন্যতম। আরো একজনের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য, তিনি স্যার জগদীশচন্দ্র বসু (৩০ নভেম্বর, ১৮৫৮ – ২৩ নভেম্বর, ১৯৩৭)। স্কুল খোলার পর বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ও বেলুড় মঠের নব দীক্ষিতদের শিক্ষার কাজে নিযুক্ত থেকেছেন নিবেদিতা। একই সময়ে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মসমাজে ‘শিক্ষা’ সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতেন নিবেদিতা। ঐ বক্তৃতা শোনার জন্য উপস্থিত থাকতেন শিক্ষিত ব্রাহ্ম মহিলারা, যাঁরা স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন যেমন কেশবচন্দ্র সেনের (১৯ নভেম্বর, ১৮৩৮ – ৮ জানুয়ারি, ১৮৮৪) মেয়ে সুনীতি দেবী ও সুচারু দেবী, রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী ও ভাগনী সরলা ঘোষ, জগদীশচন্দ্রের বোন লাবণ্যপ্রভা বসু প্রমুখ।
ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াতের ফলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার বিষয়ঃ ধর্ম, নারীশিক্ষা, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ইত্যাদি গান ও কবিতা আবৃত্তি। কখনো কখনো রবীন্দ্রনাথ বাগবাজারে নিবেদিতার বাড়িতেও যেতেন। ‘গানের আলোয় আর আনন্দের হাওয়ায় সে-ঘর যেন প্রাসাদের মতো গমগমে হয়ে ওঠে’। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে বাংলা কাব্য-সংগীতের মাধুরী পান করতে করতেই নিবেদিতা এক বছরে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। ৪ জানুয়ারি, ১৮৯৯ বান্ধবী হ্যামণ্ডকে লেখেনঃ ‘I am finding great riches in Bengali’. রবীন্দ্রনাথ, ঠাকুর পরিবার কিম্বা ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠতা থাকলেও নিবেদিতা কখনো স্বামীজীর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। লিজেল রেমঁ সে ঘটনার উল্লেখ করেছেন। একদিন রবীন্দ্রনাথ ও নিবেদিতার একটি বিষয়ে গভীর আলোচনা চলছিল। এমন সময় খবর এলো বেলুড় থেকে স্বামীজী নিবেদিতাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথকে বললেনঃ ‘স্বামীজীর আশীর্বাদ অনুক্ষণ আমায় ঘিরে আছে। এক্ষুনি আমায় যেতে হবে’ বলে তিনি তৎক্ষণাৎ সেই স্থান ত্যাগ করলেন।
স্বামীজীর প্রতি একান্ত অনুরক্ত নিবেদিতা তবে কেন ব্রাহ্মধর্মের সঙ্গে বা ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে এমন গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, এই প্রশ্ন এসেই যায়। কারণ, ব্রাহ্মধর্মের মূল কথা হলো নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা আর শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন সাকার দেবতার উপাসক। স্বামীজীর শিষ্যা নিবেদিতা তবে কি কারণে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে এমন সম্পর্ক স্থাপনের সাহস পেলেন? গবেষকরা বলছেন সেই সময় কলকাতার শিক্ষিত সমাজের বড়ো অংশ ব্রাহ্ম-মনোভাবাপন্ন। নিবেদিতা উপলব্ধি করেছিলেন দেশীয় সমাজে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রভাব ছড়াতে গেলে ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি যুবসমাজকে প্রভাবিত করার বিশেষ প্রয়োজন। তাছাড়া ব্রাহ্মদের প্রভাবিত করার ব্যাপারে নিবেদিতার এই আবেগ তাড়িত ভাবনা স্বামীজীর তাৎক্ষণিক অনুমোদন পেয়েছিল। স্বামীজী নিবেদিতাকে বলেছিলেনঃ ‘Make Inroads into the Brahmos’. রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে ধর্ম ও রাজনৈতিক দর্শন বিষয়ে মতান্তর ছিলো। নিবেদিতা তা জানতেন। তিনি চেষ্টা করেছেন উভয়কে খুব কাছাকাছি আনতে। ১৮৯৯ সালের ২৮ জানুয়ারি এক ঘরোয়া আলাপচারিতার পরিবেশে নিবেদিতা মুখোমুখি আনতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দকে। সেই চা-পানের আসরে উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র বসু, সস্ত্রীক ড. প্রসন্ন কুমার রায়, মোহিনী মোহন চট্টোপাধ্যায়, সরলা ঘোষাল, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমুখ। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ আলবার্ট হলে নিবেদিতা তাঁর বহু আলোচিত ‘Kaliworship’ বিষয়ক বক্তৃতা দেন। সেই সভায় ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার, ডাঃ নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ গুপ্ত, মিসেস সালজার, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলা ঘোষাল প্রভৃতি উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে ধর্মীয় মত ও পথ কিম্বা রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও উভয়ে উভয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। নিবেদিতা স্বামীজীর শিষ্যা, গুরু হিসেবে মেনেছেন স্বামীজী-কে আজীবন। আবার, রবীন্দ্রনাথের পরিশীলিত আভিজাত্য, পাশ্চাত্য আদব-কায়দা ও শিক্ষিত বৈদগ্ধ্যের মধ্যে আইরিশ বুদ্ধিজীবী মার্গারেট বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। নিবেদিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ ‘বস্তুত তিনি ছিলেন লোকমাতা। যে মাতৃভাব পরিবারের বাহিরে একটি সমগ্র দেশের উপরে আপনাকে ব্যাপ্ত করিতে পারে তাহার মূর্তি তো ইতিপূর্বে আমরা দেখি নাই। এ সম্বন্ধে পুরুষের যে কর্তব্যবোধ তাহার কিছু কিছু আভাস পাইয়াছি, কিন্তু রমণীর যে পরিপূর্ণ মমত্ববোধ তাহা প্রত্যক্ষ করি নাই। তিনি যখন বলিতেন our people তখন তাহার মধ্যে যে একান্ত আত্মীয়তার সুরটি লাগিত আমাদের কাহারও কণ্ঠে তেমনটি তো লাগে না। ভগিনী নিবেদিতা দেশের মানুষকে যেমন সত্য করিয়া ভালোবাসিতেন তাহা যে দেখিয়াছে সে নিশ্চয়ই ইহা বুঝিয়াছে যে, দেশের লোককে আমরা হয়তো সময় দিই, অর্থ দিই, এমন-কি, জীবনও দিই কিন্তু তাহাকে হৃদয় দিতে পারি নাই—তাহাকে তেমন অত্যন্ত সত্য করিয়া নিকটে করিয়া জানিবার শক্তি আমরা লাভ করি নাই’।
সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ্ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (২৯ মে, ১৮৬৫ - ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৩), রবীন্দ্রনাথ-জগদীশচন্দ্র বসু-নিবেদিতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী, ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকার সম্পাদক, নিবেদিতা সম্পর্কে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লিখেছেনঃ ‘ইউরোপীয় বংশসম্ভূত যত লোকের কথা আমরা অবগত আছি, তাঁহাদের মধ্যে কেহই ভারতবর্ষকে ভগিনী নিবেদিতা অপেক্ষা অধিক প্রীতি ও ভক্তি করিতেন না। তিনি ভারতভূমিকেই নিজ মাতৃভূমিস্থানে বরণ করিয়াছিলেন। তিনি বিবেকানন্দ স্বামীর শিষ্যা ছিলেন। ভারতবর্ষের কল্যাণের জন্য তিনি প্রভূত পরিশ্রম করিতেন। ভারতবাসীরা সর্বপ্রকারে উন্নত, একজাতিত্বসূত্রে বদ্ধ ও শক্তিশালী হইয়া পৃথিবীর জাতিসমূহের মধ্যে উচ্চ আসন লাভ করে, ইহা তাঁহার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল। এই ইচ্ছা ফলবতী করিবার জন্য তিনি সর্বদা চেষ্টা করিতেন। নারীর শিক্ষা ও জনসাধারণের শিক্ষা ভারতবর্ষের মঙ্গলকর সকল চেষ্টার ভিত্তি বলিয়া তিনি মনে করিতেন। তিনি স্বাধীনচিত্ত, প্রতিভাশালিনী ও শক্তিশালিনী লেখিকা ছিলেন। অনেক বিধবা ও অনাথ বালক-বালিকাকে তিনি পালন করিতেন। অনেককে শিক্ষা দিতেন। বিশ্বজননী তাঁহাকে শক্তি ও শান্তি প্রদান করুন’।
(ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক / এপ্রিল ২০, ২০২১)




Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content