জ্যোতির্ময়ী দেবী - E-Learning Bengali

Bengali E-Learning
Go to content
জ্যােতির্ময়ী দেবী (১৮৯৪-১৯৮৮)
জ্যােতির্ময়ী দেবী বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাঙালি লেখিকা। তিনি বাল্যকাল অতিবাহিত করেছেন রাজস্থানে তাই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে রাজস্থানের নারীদের কথা। গল্প লিখেছেন উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন কবিতা এবং প্রবন্ধও। বাস্তবের প্রেক্ষাপটে তাঁর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টি সুন্দরভাবে স্থান পেয়েছে তাঁর ছোটগল্পগুলিতে।
জন্ম ও পরিবার:
জ্যােতির্ময়ী দেবী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৪ সালে রাজপুতানার জয়পুর শহরে। জয়পুর রাজ্যের দেওয়ান অবিনাশচন্দ্র সেন ছিলেন তাঁর পিতা। তাঁর ঠাকুরদার নাম সংসারচন্দ্র সেন।তৎকালীন সমাজে রক্ষণশীলতা ও পর্দাপ্রথা থাকলেও জ্যেতির্ময়ী দেবীর বাড়িতে পড়াশোনার আবহাওয়া ছিল। পিতামহের গড়ে তোলা বিশাল গ্রন্থাগার ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। যা পড়ার ইচ্ছে করতো তাই পড়তে পারতেন, ফলে তিনি অনেক সারগ্রাহী জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছিলেন।
বিবাহিত জীবন:
জ্যােতির্ময়ী দেবীর দশবছর বয়সে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার সাহিত্যপ্রেমী ও অভিজাত পরিবারের আইনজীবি কিরণচন্দ্র সেনের সঙ্গে বিবাহ হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ১৯১৮ সালে তাঁর স্বামী ইনফ্লুয়েঞ্জায় মারা যান। ২৫ বছর বয়সে একটি সন্তানকে স্বামীর বাড়িতে রেখে বাকি সন্তানদের নিয়ে তিনি পিত্রালয়ে ফিরে আসেন। তাঁর ছয় সন্তান-অমিয়, অনুভা, অরুণচন্দ্র, অশোকা, অমিতাভ ও অঞ্জলি।
সাহিত্যিক জীবন:
স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন। জ্যোতির্ময়ী দেবী প্রতিবাদী স্পষ্টভাষায় বহু ছোটগল্প রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। সহানুভূতিশীল হয়ে তিনি তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসে রূপ দিয়েছেন ঐকান্তিক নিষ্ঠায়। মহিলা ও দলিতদের অধিকার নিয়ে অ-কল্পকাহিনি রচনা করেছেন। লেখার জগতে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিলেন তাঁর বন্ধু কবি কান্তিচন্দ্র ঘোষ। তাঁর "একটি কবিতা ও নারীর কথা' নামে একটি প্রবন্ধ কান্তিচন্দ্র "ভারতবর্ষ' পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন। ১৯২২ সাল থেকে তাঁর লেখা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে কবি হিসাবে। পরবর্তীকালে তিনি অনেক গল্প রচনা করেছিলেন। প্রথমদিকে তিনি সুমিত্রা দেবী ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তাঁর কবিতা, ছোটগল্প রচিত হয়েছিল সহজ ও সরল ভাষায়, কিন্তু প্রকাশের ভঙ্গি ছিল দৃঢ়। রচনার কোথাও জটিল শব্দের প্রয়োগ নেই এটিই ছিল তাঁর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। নিজের আবেগ ও সমাজচিন্তাকে একজায়গায় আনতে পেরেছিলেন জ্যােতির্ময়ী দেবী তাঁর কবিতায়। "চক্রবাল' নামে তাঁর কবিতা সংকলনটির ভূমিকায় শ্রী উমানাথ ভট্টাচার্য বলেছেন-
"কবিতাগুলি পড়ে মনে হয় কবি যশপ্রার্থিনী হয়ে এগুলি রচিতও হয়নি। এ লেখা তো মনের বাহন না লিখে মুক্তি নেই।'

বাংলা সাহিত্যের ভৌগলিক সীমাকে তিনি যথার্থই প্রসারিত করেছিলেন সেইকারণে তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন -
"তাঁর সাহিত্য কর্মকে অনন্য সাহিত্যকীর্তি বলে অভিহিত করতে পারি।'
সজনীকান্ত দাস তাঁর গল্প সম্পর্কে বলেছিলেন,
"গল্পগুলি আমি পড়িয়াছি এবং এই ভাবিয়া লজ্জা অনুভব করিতেছি যে এতদিন ইহার রচনার সহিত পরিচিত হই নাই। প্রবাসী বাঙালীর জীবনযাত্রার অনবদ্য আলেখ্য তাঁহার গল্পে ফুটিয়া উঠিয়াছে।'
নারীমুক্তিবাদী জ্যোতির্ময়ী দেবী:
দেশের পরাধীনতা এবং মেয়েদের পরাধীনতা জ্যোতির্ময়ী দেবীর কাছে একইভাবে এসেছে। তাঁর জীবনের সংগ্রাম থেকেই জন্ম নেয় তাঁর নারীবাদী চেতনা। অকালবৈধব্যের নিঃসঙ্গতায় তাঁর নজর পড়ে সমাজের প্রতি। সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য তিনি কলম ধরেছিলেন, যারমধ্যে মেয়েরা ছিল অন্যতম। অবহেলিত নারীসমাজের মর্মবেদনার এক চিরন্তন আলেখ্য তিনি এঁকেছেন তার বলিষ্ট ও আন্তরিক কলমের আঁচড়ে। সমাজের অনুশাসন যাদের সমাজেরই প্রত্যন্ত-প্রদেশে ঠেলে দেয় তাদের সম্পর্কে লেখিকার মমতা ছিল অপরিসীম। আজকে আমরা কাশীর বাঙালি বিধবাদের যে দুঃখময় জীবনের কথা শুনি, জ্যোতির্ময়ী দেবী তাঁর "পিঁজরাপোল' গল্পটিতে সেই অগণিত নারীবাহিনীকে তুলে ধরেছিলেন তাদের হাসি কান্নার মধ্য দিয়ে-
"হৈম অবাক হয়ে এই নারী জনস্রোত দেখে। শুধু তার মনে হয় মানুষের কি বিপুল অপচয়। সহসা এই অপচয়ের একেবারে গোড়ার কথা তার মনে হল একান্ত দেহগত দরকারের ওপর, অস্তিত্বের ওপর এই আদর্শের ভিত্তি। যাকে বহু কাব্যে অলংকৃত করে, সুন্দর অলংকার বহু মহিমায় ভূষিত করে চিরদিন বলা হয়।ধনী, দরিদ্র, ইতর, ভদ্র, অভদ্র, সভ্য, অসভ্য, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব মেয়েরাই এই চিরন্তন এক পথ-এক প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন। বাঙালি শিক্ষিত সমাজের পিতৃতন্ত্র যাদের পরিত্যাগ করেছে সমাজের প্রত্যন্ত প্রদেশে তাদের দেখতে পাওয়া যায় কাশী শহরে। এদের মধ্যে অনেকেই সমাজের চোখে পতিতা। জ্যােতির্ময়ী দেবী বার বার সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছেন যে সমাজের অনুশাসন যাই বলুক, এরা আসলে মানুষ।'

যে স্ত্রীশিক্ষার অভাব তিনি নিজের জীবনে অনুভব করেছিলেন তাঁর কথাসাহিত্যের নায়িকারা কিন্তু সেই শিক্ষাকে ব্যবহার করেছিলেন আত্মপ্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস "ছায়াপথ'-এর নায়িকা সুপ্রিয়া স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। পিতার অকালমৃত্যুতে হঠাৎ গরিব হয়ে গিয়ে যখন সে দেখে ধনসম্পত্তি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার লোভে তার প্রতিবেশী প্রণয়ী অজিত বাবা-মার কথামতো অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করে তখন সুপ্রিয়া হয়ে উঠে এক অন্যমাপের মানুষ।

জ্যোতির্ময়ী দেবীর ছোটগল্পে রাজপুতানার মেয়েদের নিপীড়নের ছবি ফুটে উঠে তাদের জীবনের ছোট ছোট সুখ দুঃখের ঠাসবুনুনির মধ্য দিয়ে। মেয়েদের প্রতি সামাজিক অবিচার, অবজ্ঞা ও তজ্জনিত পরনির্ভরতা জ্যোতির্ময়ী দেবীর মনে ব্রিটিশ শাসনের অধীনতার সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। নারীর অবরোধমোচন স্বাধীনতা আন্দোলন সবকিছু নিয়েই তিনি লিখেছেন। তাঁর চোখে যখনই যে প্রথা, সংস্কার বা আইন সংস্কারযোগ্য মনে হয়েছিল তিনি বলিষ্ঠভাবে তা নিজের লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি লেখনীর মাধ্যমে নারী সমাজকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছিলেন, তাঁর দেখানো পথে অগ্রসর হলে নারীরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। সামাজিক আইনে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর দান অপরিসীম। এ সম্পর্কে রেণুকা রায় লিখেছিলেন-
"সামাজিক আইনে নারীর সম-অধিকার আন্দোলনে তিনি আমার মা স্বর্গীয়া চারুলতা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছেন। এই কাজে তাঁর দান অপরিসীম। তাঁর মতো স্বনামধন্য মহিলার এই প্রবন্ধ রচনাবলীর (প্রবন্ধ সংগ্রহ -চিরন্তন নারী জিজ্ঞাসা) ভূমিকা লিখতে পেরে আমি বিশেষ গর্বিত।'
রচনাবলী:
উপন্যাস
১) ছায়াপথ (১৩৪১)
২) বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ (১৩৫৫, ১৯৪৮খ্রীঃ)
৩) মনের অগোচরে (১৩৫৯, ১৯৫২)
৪) এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা (১৩৭৪, ১৯৬৮খ্রীঃ) (উৎসর্গ -সকল যুগের সকল দেশের অপমানিতা লাঞ্চিতা নারীদের উদ্দেশ্যে)
৫) হরিজন উন্নয়ন কথা (১৩৮১ থেকে ১৩৮২ সালের কয়েকমাসের প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এটি প্রকাশিত হয়েছিল)
গল্পগ্রন্থ
১) রাজযোটক (১৩৪৭)
২) আরাবল্লীর আড়ালে (প্রকাশকাল অজ্ঞাত)
৩) ব্যান্ডমাস্টারের মা (১৩৬৮, ১৯৬১)
৪) আরাবল্লীর কাহিনী (১৩৭২)
৫) সোনা রূপা নয় (১৩৭৬, ১৯৬৯)
৬) মর্ত্যের অপ্সরা (১৩৯৪)
গল্প:
১) তিনজন (১৩২৭)
২) লেডিস ক্লাব (১৩২৭)
৩) চারধাম (১৩২৮)
৪) গঙ্গাফড়িং
৫) স্ত্রীধন
৬) মণি-কর্ণিকা (১৩৩৭)
৭) মা (১৩৩৮)
৮) অমর (১৩৩৯)
৯) তেপান্তরের মাঠ (১৩৩৯)
১০) দর ও দস্তুর (১৩৩৯)
১১) সন্ন্যাসী (১৩৩৯)
১২) রাজযোটক (১৩৪০)
১৩) ময়ূর সিংহাসন (১৩৪১)
১৪) আগাছা (১৩৪১)
১৫) জননী (১৩৪২)
১৬) বিশুদ্ধ প্রেম (১৩৪৬)
১৭) আরাবল্লীর আড়ালে (১৩৫২)
১৮) খুশনজরজী (১৩৫২)
১৯) লালজী সাহেব (১৩৫৩)
২০) সুমেরু রায় (১৩৫৪)
২১) মাজী সাহেব (১৩৫৪)
২২) কুমেদানজী (১৩৫৪)
২৩) সেপাই পিসিমা (১৩৬১)
২৪) বাইজীলাল (১৩৬৮)
২৫) রাজা রাণী ও কেশর (১৩৪০)
২৬) বরযাত্রা (১৩৪৪)
২৭) রামচন্দ্রজীর শ্রাদ্ধ (১৩৬৩)
২৮) ধাপি (১৩৫২)
২৯) লালজীসাহেব (১৩৫২)
৩০) পুণ্য পরিক্রমা
৩১) ফণীমনসার বন
৩২) বেটি কা বাপ (১৩৭১)
তীর্থ পরিক্রমা:
সময় ও সুকৃতি (১৩২৫)
আত্মজীবনীমূলক রচনা
১) স্মৃতি বিস্মৃতির তরঙ্গ (১৯৮৬,১৩৯৩)
প্রবন্ধ সংগ্রহ
১) চিরন্তন নারী জিজ্ঞাসা (১৯৮৮)
প্রবন্ধ
১) আমার লেখার গোড়ার কথা (১৩৭৫-৭৬)
২) নারীর কথা (১৩২৮)
৩) নারী সমস্যা (১৩২৮)
৪) সমস্যা কাদের ও কেন? (১৩৩৬)
৫) পরিত্যক্ত ও বিবাহ বিচ্ছেদ (১৩৩৮)
৬) অসবর্ণ -বিবাহ (১৩৩৮)
৭) সমাজের একটি অন্ধকার দিক (১৯৫৭)
৮) পতিতা প্রসঙ্গে
৯) সহ-অধ্যয়ণ (১৩৩৯)
১০) আওড়ৎ ও হাতিয়ার (১৩৪০)
১১) নারীশালা -হারেম -নারী (১৩৫২)
১২) কনে দেখা (১৩৬১)
১৩) হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার (১৯৬৫)
১৪) মেয়েদের উত্তরাধিকারের পুরাতন কথা (১৩৬২)
১৫) মেয়েদের উত্তরাধিকার (১৩৬২)
১৬) নারীর জীবন ও অধিকার (১৯৭৫)
১৭) নারী সেকালে একালে
১৮) স্বাধীন ভারতবর্ষে মেয়েদের অধিকার (১৩৬১)
১৯) নারীর ইতিহাস (১) (১৩৭৪)
২০) নারীর ইতিহাস (২) (১৩৭৬)
২১) নারী জিজ্ঞাসা (১৩৭৭)
কবিতা সংকলন:
১) চক্রবাল (১৩৮৬)
পুরস্কার এবং সম্মাননা:
১) ১৯৬৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করে।
২) ১৯৭৩ সালে জ্যোতির্ময়ী দেবী রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন "সোনা রূপা নয়' গল্পগ্রন্থের জন্য।
৩) ১৯৮২ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তাঁকে "হরনাথ ঘোষ স্মৃতি পদক' প্রদান করে।
জীবনাবসান:
১৯৫৯ সাল থেকে তিনি আমৃত্যু কলকাতার শ্যামবাজারে বসবাস করতেন।তিনি ১৯৮৮ সালে ১৭ নভেম্বর কলকাতায় প্রয়াত হন।
প্রবন্ধ: জয়িতা এস্‌
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া :জ্যােতির্ময়ী দেবী
জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন
(প্রকাশিত ১০.০৬.২০২১)
There are no reviews yet.
0
0
0
0
0

Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content