মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় - Bengali E Learning

Bengali E-Learning
Go to content

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
(১৯ মে, ১৯০৮ - ৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৬)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীজুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মুহূর্তে বাংলা কথাসাহিত্যে যে কয়েকজন লেখকের হাতে সাহিত্যজগতে নতুন এক বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি। জীবনের প্রথমভাগে তিনি ফ্রয়েডীর মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এছাড়া মার্কসবাদও তাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। তাঁর অধিকাংশ রচনাতেই এই দুই মতবাদের নিবিড় প্রভাব  লক্ষ্য করা যায়।
জন্ম ও পরিবার:
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মে (১৩১৫  বঙ্গাব্দের ৬ জ্যৈষ্ঠ) মঙ্গলবার, বিহারের সাঁওতাল পরগনার, বর্তমান ঝাড়খন্ড রাজ্যের দুমকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস বর্তমান বাংলাদেশে, ঢাকার বিক্রমপুরের অন্তর্গত মালপদিয়া গ্রামে । তাঁর পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা নীরদা দেবী। পিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের  গ্র্যাজুয়েট। তিনি সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকরি করতেন এবং শেষ জীবন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডাকনাম মানিক। ১৯২৮ সালের ২৮ মে , টাঙ্গাইলে তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে।
শিক্ষাজীবন:
পিতার চাকরির সূত্রে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাল্য - কৈশোর ও হাইস্কুলের শিক্ষাজীবন বিক্ষিপ্তভাবে অতিবাহিত হয় উড়িষ্যা, বিহার ও অখন্ড বাংলার এক বিস্তৃত অঞ্চলে - প্রধানত দুমকা, আড়া, সাসারাম, সমগ্র মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন অংশ, কুমিল্লার অন্তর্গত ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বারাসাত, কলকাতা, ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল প্রভৃতি স্থানে । ১৯২৬ সালে মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় গণিতে বিশেষ কৃতিত্বসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯২৮ সালে বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ান  মিশন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই. এস. সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অংকশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে বি.এস.সি ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু পাঠ অসমাপ্ত রেখেই পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন।
কর্মজীবন:
১৯৩৭ সালে মেট্রোপলিটান প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং হাউজ লিমিটেড এর পরিচালনাধীন মাসিক ও সাপ্তাহিক "বঙ্গশ্রী' পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন । ১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি "বঙ্গশ্রী' পত্রিকার সম্পাদকের চাকরিতে ইস্তফা দেন । ১৯৩৯ সালে ভ্রাতা সুবোধকুমারের সহযোগিতায় "উদয়াচল প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং হাউস' নামে ছাপাখানা ও প্রকাশনালয় স্থাপন করেন । "বঙ্গশ্রী' পত্রিকা থেকে পদত্যাগের পর তাঁর দ্বিতীয় এবং শেষ চাকরি জীবন শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে - তৎকালীন ভারত সরকারের ন্যাশনাল ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অরগানাইজার, বেঙ্গল দপ্তরে পাবলিসিটি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে তিনি যোগদান করেন এবং অন্তত ১৯৪৩ সালের শেষ পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। এই সময় থেকেই অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্র থেকে যুদ্ধ-বিষয়ক প্রচার ও আরোও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন। ১৯৪৪ সালের ১৫-১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত ফ্যাসিস্ট- বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি মন্ডলীর অন্যতম সদস্য হন।  ক্রমে প্রগতি লেখক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৪ সালেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। কমিউনিস্ট পার্টি ও পার্টির সাহিত্য ফ্রন্টের সঙ্গে আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৪৪ সালের ২৫-২৭ আগস্টে অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে সাধারণ অধিবেশনের অন্যতম সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সালের ৩-৮ মার্চে অনুষ্ঠিত ফ্যাসিস্ট - বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি মন্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। ১২ মে তারিখে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে "গল্প লেখার গল্প' পর্যায়ে ভাষণ দান করেন তিনি। ১৯৪৬ সালের ১৬  আগস্ট ও পরবর্তী কয়েকটি দিনের ঐতিহাসিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, দাঙ্গা- বিধ্বস্ত টালিগঞ্জ অঞ্চলে, জীবন বিপন্ন করে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও  মৈত্রী প্রয়াসে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে বোম্বাই- এ অনুষ্ঠিত প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে, গণসাহিত্য শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি । ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনেরও সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালের ১১-১৫ এপ্রিল, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম বা শেষ বার্ষিক সম্মেলন।
বিবাহ:
১৯৩৮ সালের ১১ মে, ২৮ বৈশাখ ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ, ময়মনসিংহ গবর্নমেন্ট গুরুট্রেনিং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং বিক্রমপুর পঞ্চসার নিবাসী, প্রয়াত সুরেন্দ্রচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তৃতীয় কন্যা শ্রীযুক্ত  কমলা দেবীর সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবাহ হয়।
সাহিত্য:
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ত্রিশোত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের একজন শক্তিমান লেখক । কলেজে পড়াকালীন সময়ে কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গে তর্কে বাজি ধরে প্রথম গল্প "অতসী মামী' রচনা করেন এবং ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যায় ( ডিসেম্বর ১৯২৮ ) "বিচিত্রা' পত্রিকায় তা ছাপা হয় । বিচিত্রা পত্রিকায় "অতসী মামী' গল্প প্রকাশের পর সাহিত্য জগতে আলোড়ন দেখা দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি পরিচিত হয়ে উঠে বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে। এরপর থেকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখা পাঠাতে থাকেন তিনি । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রচনায় মানুষের  অন্তর্জীবন  ও মনোলোক বিশ্লেষণে শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রথম দিকের রচনায় নিপুণভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে মানুষের অবচেতন মনের নিগূঢ় রহস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তর পরবর্তী রচনায় তাঁর সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশের ফলে তাঁর একাডেমিক পড়াশুনার ব্যাপক ক্ষতি হয়, শেষাবধি তাঁর সাহিত্য জীবনের ইতি ঘটে । সাহিত্য রচনাকেই তিনি তাঁর মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন ।
গ্রন্থ তালিকা:
উপন্যাস:
১) জননী (১৯৩৫)
২) দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫)
৩) পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬)
৪) পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬)
৫) জীবনের জটিলতা (১৯৩৬)
৬) অমৃতস্য পুত্রাঃ (১৯৩৮)
৭) শহরতলি (প্রথম খন্ড ১৯৪০)
৮) শহরতলি (দ্বিতীয় খন্ড ১৯৪১)
৯) অহিংসা (১৯৪১)
১০) ধরাবাঁধা জীবন (১৯৪১)
১১) চতুষ্কোণ (১৯৪১)
১২) প্রতিবিম্ব (১৯৪৩)
১৩) দর্পণ (১৯৪৫)
১৪) চিন্তামণি (১৯৪৬)
১৫) শহরবাসের ইতিকথা (১৯৪৬)
১৬) চিহ্ন (১৯৪৭)
১৭) আদায়ের ইতিহাস (১৯৪৭)
১৮) জীয়ন্ত (১৯৫০)
১৯) পেশা (১৯৫১)
২০) স্বাধীনতার স্বাদ (১৯৫১)
২১) সোনার চেয়ে দামী ( প্রথম খন্ড ১৯৫১)
২২) ছন্দপতন (১৯৫১)
২৩) সোনার চেয়ে দামী ( দ্বিতীয় খন্ড ১৯৫২)
২৪) ইতিকথার পরের কথা (১৯৫২)
২৫) পাশাপাশি (১৯৫২)
২৬) সার্বজনীন (১৯৫২)
২৭) নাগপাশ (১৯৫৩)
২৮) আরোগ্য (১৯৫৩)
২৯) চালচলন (১৯৫৩)
৩০) তেইশ বছর আগে পরে (১৯৫৩)
৩১) হরফ (১৯৫৪)
৩২) শুভাশুভ (১৯৫৪)
৩৩) পরাধীন প্রেম (১৯৫৫)
৩৪) হলুদ নদী সবুজ বন (১৯৫৫)
৩৫) মাশুল (১৯৫৬)
গল্পগ্রন্থ:
১) অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প (১৯৩৫)
২) প্রাগৈতিহাসিক (১৯৩৭)
৩) মিহি ও মোটা কাহিনী (১৯৩৮)
৪) সরীসৃপ (১৯৩৯)
৫) বৌ (১৯৪০)
৬) সমুদ্রের স্বাদ (১৯৪৩)
৭) ভেজাল (১৯৪৪)
৮) হলুদপোড়া (১৯৪৫)
৯) আজ কাল পরশুর গল্প (১৯৪৬)
১০) পরিস্থিতি (১৯৪৬)
১১) খতিয়ান (১৯৪৭)
১২) মাটির মাশুল (১৯৪৮)
১৩) ছোট বড় (১৯৪৮)
১৪) ছোট বকুলপুরের যাত্রী (১৯৪৯)
১৫) ফেরিওয়ালা (১৯৫৩)
১৬) লাজুকলতা (১৯৫৪)
নাটক:
১) ভিটেমাটি (১৯৪৬)
অন্যান্য:
১) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৫০)
২) মানিক গ্রন্থাবলী ( প্রথম ভাগ ১৯৫০)
৩) মানিক গ্রন্থাবলী ( দ্বিতীয় ভাগ ১৯৫২)
৪) স্ব-নির্বাচিত গল্প ( গল্প সংকলন )(১৯৫৬)
মরণোত্তর প্রকাশ:
১) প্রাণেশ্বরের উপাখ্যান, উপন্যাস (ডিসেম্বর ১৯৫৬)
২) মাটি ঘেঁষা মানুষ, অসম্পূর্ণ উপন্যাস (১৯৫৭)
৩) লেখকের কথা, প্রবন্ধ সংকলন (সেপ্টেম্বর ১৯৫৭)
৪) গল্পসংগ্রহ (নভেম্বর ১৯৫৭)
৫) ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প (জুন ১৯৫৮)
৬) শান্তিলতা, উপন্যাস (১৯৬০)
৭) মাঝির ছেলে, কিশোর উপন্যাস (১৯৬০)
৮) উত্তর কালের গল্পসংগ্রহ, (নভেম্বর ১৯৬৩)
৯) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প, নূতন সম্পাদিত চতুর্থ সংস্করণ (জুন ১৯৬৬)
১০) কিশোর বিচিত্রা (এপ্রিল ১৯৬৮)
১১) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা (মে ১৯৭০)
১২) মানিক গ্রন্থাবলী, তেরো খণ্ডে সম্পূর্ণ "গ্রন্থালয়' সংস্করণ (১৯৬৩ - ১৯৭৫)
অসম্পূর্ণ রচনা:
১) মশাল- কিশোর উপন্যাস, "রংমশাল' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত।
২) মাটির কাছে কিশোর কবি- কিশোর উপন্যাস, "আগামী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত।
শেষ জীবন:
১৯৫৬ সালের গোড়া থেকেই ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রির আক্রমণে একাধিকবার আক্রান্ত হন এবং ২৫ জুন তারিখে প্রায় মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৫৬ সালের ২ ডিসেম্বর, সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে নীত হন। ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর (১৩৬৩ বঙ্গাব্দ, ১৭ অগ্রহায়ণ) সোমবার, অতি প্রত্যুষে উক্ত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিমতলা শ্মশানঘাটে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।


প্রবন্ধ: সুইটি নাথ
তথ্যসূত্র:
১) চক্রবর্তী যুগান্তর: অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
২) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়- উইকিপিডিয়া।
৩) বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক- বাংলাপিডিয়া।
৪) ভৌমিক অরিন্দম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
(প্রকাশ: ১৪.০৫.২০২১)
There are no reviews yet.
0
0
0
0
0

Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content