Page 102 - E-Learning Bengali

Bengali E-Learning
Go to content
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১৮৭৭-১৯৫৭)
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার একজন বিখ্যাত বাংলা শিশুসাহিত্যিক ছিলেন। বাংলা শিশু সাহিত্যে রূপকথার জনক বলে খ্যাত। সর্বপ্রথম 'ঠাকুরমার ঝুলি' প্রকাশের মাধ্যমে বাংলার রূপকথাকে জনসমক্ষে তুলে ধরেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার।'ঠাকুরমার ঝুলি'র স্রষ্টা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার শুধুমাত্র রূপকথার জনকই ছিলেন না,বাঙালি সমাজে তিনি পরিচিত ছিলেন লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক,ছড়াকার,চিত্রশিল্পী,দারুশিল্পী এবং কিশোর কথাকার হিসেবেও।এদেশের কিশোর কিশোরীদের সাহিত্যমুখী করতে তিনি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

*জন্ম* *ও* *পরিবার* :-

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৭ সালে ঢাকা জেলার উলাইল গ্রামের বিখ্যাত মজুমদার বংশে।তাঁর পিতার নাম রমদারঞ্জন মিত্র মজুমদার ও মাতার নাম কুসুমময়ী দেবী।তিনি ছিলেন বাবা-মার একমাত্র সন্তান।তার জীবনের অনেকটা জুড়ে ছিলেন মা কুসুমময়ী দেবী,মূলত শিশু দক্ষিণারঞ্জনের সামনে রূপকথার জগত খুলে দিয়েছিলেন তার মা।কুসুমময়ী দেবীর হঠাৎ মৃত্যু হলে দক্ষিণারঞ্জনকে সামলানোর দায়িত্ব নেন তার পিসী রাজলক্ষ্মী দেবী।

*শিক্ষাজীবন* :-

১৮৮৭ সালে দশবছর বয়সে তাকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয় ঢাকার কিশোরীমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে।১৮৯৩ সালে কিশোরীমোহন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে দক্ষিমারঞ্জনকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়।পরবর্তীকালে তাকে টাঙ্গাইলের সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়।১৮৯৮ সালে তিনি  মুর্শিদাবাদের বহরমপুর হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।এরপর কৃষ্ণনাথ কলেজে এফ এ ক্লাসে ভর্তি হন।

*কর্মজীবন* :-

দক্ষিণারঞ্জনের  কর্মজীবন এবং সাহিত্যিক জীবন প্রায় একই।সারাজীবনই তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন।এই সংগ্রহ চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে :-রূপকথা,গীতিকাব্য,রসকথা ও ব্রতকথা।
১৯০২ সালে পিতার মৃত্যুর পর থেকে তিনি টাঙ্গাইলে পিসীর বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।তখন পিসী রাজলক্ষ্মী দেবী তাকে জমিদারী দেখাশোনার দায়িত্ব দেন।পিসীর বাড়িতে থাকাকালীন এই কৃষিকাজ তদারকি করা তার কর্মজীবনের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।এছাড়াও তিনি বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সহ-সভাপতি ও উক্ত পরিষদের মুখপত্র -'পথ' এর সম্পাদক ছিলেন এবং পরিষদের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা সমিতির সভাপতিরূপে বাংলায় বিজ্ঞানের বহু পরিভাষা রচনা করেন।

*সাহিত্যিক* *জীবন* :-

সাহিত্যচর্চার প্রতি অপরিসীম আগ্রহ ছিল দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের।প্রথমদিকে সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা প্রদীপ প্রভৃতি পত্রিকাতে তাঁর প্রবন্ধাবলি প্রকাশিত হয়েছিল।১৯০১ সালে দক্ষিণারঞ্জনের সম্পাদিত মাসিক 'সুধা' পত্রিকা প্রকাশিত হয়।তাঁর প্রথম কাব্য 'উত্থান' প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে।তিনি সুধা,সারথি,পথ ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল রূপকথার সাম্রাজ্য তৈরি করা।দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার রূপকথার গল্পগুলি সংগ্রহ করেছিলেন তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে।তাঁর সংগৃহিত জনপ্রিয় রূপকথার সংকলনটি চারটি খন্ডে প্রকাশিত:'ঠাকুরমার ঝুলি','ঠাকুরদাদার ঝুলি','ঠানদিদির থলে','দাদামহাশয়ের থলে'।তিনি গল্পগুলি সংগ্রহ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু উনার লেখনীর গুণে গল্পগুলি হয়ে উঠেছিল শিশুমনোরঞ্জক।'ঠাকুরমার ঝুলি' বাংলা শিশুসাহিত্যের একটি জনপ্রিয় রূপকথার সংকলন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ঠাকুরমার ঝুলি'র ভূমিকাতে লিখেছিলেন:
"তিনি ঠাকুরমার মুখের কথাকে ছাপার অক্ষরে তুলিয়া পুতিয়াছেন তবু তাহার পাতাগুলি প্রায় তেমনি সবুজ তেমনি তাজাই রহিয়াছে;রূপকথার সেই বিশেষ ভাষা,সেই বিশেষ রীতি,তাহার সেই প্রাচীন সরলতাটুকু তিনি যে এতটা দূর রক্ষা করিতে পারিয়াছেন,ইহাতে তাহার সূক্ষরসবোধ ও স্বাভাবিক কলানৈপুণ্য প্রকাশ পাইয়াছে।"
'ঠাকুরমার ঝুলি' লেখা শেষ হওয়ার পর প্রকাশনার জন্য বিভিন্ন প্রকাশকের কাছে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরে আসার পর তাঁর দেখা হয় বিখ্যাত অধ্যাপক-গবেষক দীনেশচন্দ্র সেনের সঙ্গে।পরবর্তীতে ১৯০৭ সালে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্যোগে তখনকার নামী প্রকাশনা সংস্থা ভট্টাচার্য অ্যান্ড সন্স থেকে ঠাকুরমার ঝুলি প্রকাশিত হয়।এরমধ্যে রয়েছে চৌদ্দটি গল্প:-কলাবতী রাজকন্যা,ডালিমকুমার,নীলকমল আর লালকমল,ঘুমন্ত পরী,সাত ভাই চম্পা,কিরণমালা,কাঁকনমালা কাঞ্চনমালা ইত্যাদি।'ঠাকুরমার ঝুলি'র ভূমিকা অংশ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বোলপুরে,২০শে ভাদ্র,১৩১৪ বঙ্গাব্দে):-
"দেশের শিশুরা কোন পাপে আনন্দের রস হইতে বঞ্চিত হইল?-মাতৃদুগ্ধ একেবারে ছাড়াইয়া লইয়া কেবলই ছোলার ছাতু খাওয়াইয়া মানুষ করিলে ছেলে কি বাঁচে?-কেবল বইয়ের কথা দেশলক্ষ্মীর বুকের কথা কোথায়?-বাংলার ছেলে যখন রূপকথা শোনে,সমস্ত বাংলাদেশে চিরন্তন স্নেহের সুরটি তাহার চিত্তের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তাহাকে যেন রসে রসাইয়া লয়।"

Bishwajit Bhattacharjee, [13.06.21 21:54]
সুকুমার রায় (৩০ অক্টোবর ১৮৮৭ -  ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩)

জন্ম এবং বংশ পরিচয়

 বাংলা নবজাগরণের স্বর্ণযুগে এক দক্ষিণ রাঢ়ীও কায়স্থ বংশে সুকুমার রায়ের জন্ম।
তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত বাঙালি শিশুসাহিত্যিক ও ভারতীয় সাহিত্যে "ননসেন্স ছড়া"র প্রবর্তক। তিনি একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও ছিলেন।
সুকুমার রায় ১৮৮৭ সালের
৩০ অক্টোবর রচনা বাংলাদেশের (ব্রিটিশ ভারত ) কিশোরগঞ্জ জেলার কাটিয়াদি উপজেলায় মসূয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ এক সম্পন্ন ব্রাহ্মণ পরিবারে করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং তার মাতা বিধুমুখী দেবী। সুকুমারের মাতা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম সংস্কারক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে। রায় পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায় তাঁদের পূর্বপুরুষ শ্রী রামসুন্দর দেও (দেব) অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার চাকদহ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন৷ ভাগ্যাণ্বেষণে তিনি পৈতৃক গ্রাম ত্যাগ করে পূর্ববঙ্গের শেরপুরে গমন করেন ৷ তারপর যশোদলের জমিদার রাজা গুণীচন্দ্রের সাথে সাক্ষাৎ হয়। এবং রাজা গুণীচন্দ্র রামসুন্দরের সুন্দর চেহারা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হন এবং রামসুন্দরকে তাঁর সাথে তাঁর জমিদারিতে নিয়ে যান ৷ গুনীচন্দ্র রামসুন্দরকে নিজের জামাতা বানিয়ে অনেক জমি-জমা দেন ৷ সেই থেকে রামসুন্দর যশোদলে বসবাস শুরু করেন ৷ পরবর্তীকালে তাঁর বংশধররা সেখান থেকে সরে গিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলায় মসূয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন৷ সুকুমার রায়রা ছয় ভাই বোন ছিলেন। তার দুই ভাই সুবিনয় রায় এবং সুবিমল রায় ও তার তার তিন বোন ছিল, তারা হলেন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা। বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায় উহ্যনাম পন্ডিত ছদ্মনামেও পরিচিত ছিলেন

শিক্ষাজীবন:-

সুকুমার সেন এর পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যানুরাগী, যা তার মধ্যকার সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। পিতা উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন শিশুতোষ গল্প ও জনপ্রিয়-বিজ্ঞান লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার ও শৌখিন জ্যোতির্বিদ। উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি সুকুমারকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিলেন। এছাড়াও রায় পরিবারের সাথে জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল। ছোটবেলায় পিতা উপেন্দ্রকিশোরের হাতেই ছবি আঁকায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। তিনি গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর কলকাতার সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় বি.এস.সি. (অনার্স) নিয়ে পাশ করেন । তারপর তিনি মুদ্রণবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্য ১৯১১ সালে বিলেত যাত্রা করেন। সেখানে  লন্ডনের L.C.C.School of Photo Engraving and Lithography তে বিশেষ ছাত্ররূপে ভর্তি হন।
এই সময় ফটোগ্রাফিক সােসাইটি লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়াশােনাও করতেন। ১৯১২ খ্রিঃ ম্যাঞ্চেস্টারের স্কুল অব টেকনােলজিতে বিশেষ ছাত্ররূপে স্টুডিও ও লেবরেটরির কাজ শিখেছিলেন। তিনি আলোকচিত্র ও মুদ্রণ প্রযুক্তির ওপর পড়াশোনা করেন এবং কালক্রমে তিনি ভারতের অগ্রগামী আলোকচিত্রী ও লিথোগ্রাফার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ফটোগ্রাফিতে তিনি অসাধারন দক্ষতা অর্জন করেছিলেন বলেই তাঁর ‘বায়োস্কোপ’ প্রবন্ধে Time lapse photography-এর মতো একটা জটিল বিষয়েকে এত সহজ সরলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
এইসময় East and West Society- এর আহ্বানে সুকুমার রায় তাঁর নিজের লেখা প্রবন্ধ ‘The Spirit of Rabindranath’ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধের সঙ্গে কবিগুরুর অনেকগুলি কবিতার অনুবাদ ছিল। পরে প্রবন্ধটি Quest পত্রিকায় ছাপা হয়। সুকুমার রায় দু বছর বিলেত ছিলেন। লন্ডনে থাকা কালে সুকুমার রয়েল ফটোগ্রাফিক সােসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। তার আগে একমাত্র স্যার যতীন্দ্রমােহন ঠাকুর এই সম্মান পেয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে সুকুমার কলকাতাতে ফিরে আসেন ।

বিবাহ:- সুকুমার রায় ১৯১৪ সালে সুপ্রভা দেবীকে বিবাহ করেন। তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তান বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়।

                     কর্মজীবন

সংবাদপত্র :-  

উপেন্দ্রকিশোর  উন্নত-মানের রঙিন হাফটোন ব্লক তৈরি ও মুদ্রণক্ষম একটি ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছোটদের একটি মাসিক পত্রিকা, 'সন্দেশ', এই সময় প্রকাশনা শুরু করেন। সুকুমারের বিলেত থেকে ফেরার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। উপেন্দ্রকিশোর জীবিত থাকতে সুকুমার লেখার সংখ্যা কম থাকলেও উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর সন্দেশ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব সুকুমার নিজের কাঁধে তুলে নেন। শুরু হয় বাংলা শিশুসাহিত্যের এক নতুন অধ্যায়। পিতার মৃত্যুর পর আট বছর ধরে তিনি সন্দেশ ও পারিবারিক ছাপাখানা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তার ছোটভাই এই কাজে তার সহায়ক ছিলেন এবং পরিবারের অনেক সদস্য 'সন্দেশ'-এর জন্য নানাবিধ রচনা করে তাদের পাশে দাড়ান।
সংগঠন  :-

Bishwajit Bhattacharjee, [13.06.21 21:54]
প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়বার সময় তিনি ননসেন্স ক্লাব নামে একটি সংঘ গড়ে তুলেছিলেন। এর মুখপাত্র ছিল ‘ সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ নামের একটি পত্রিকা। সেখানেই তার আবোল-তাবোল ছড়ার চর্চা শুরু। পরবর্তীতে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে তিনি মানডে ক্লাব (Monday Club) নামে  আরেকটি ক্লাব খুলেছিলেন । মনডে ক্লাবের সাপ্তাহিক সমাবেশে সদস্যরা 'জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ' পর্যন্ত সব বিষয়েই আলোচনা করতেন। সুকুমার রায় মজার ছড়ার আকারে এই সাপ্তাহিক সভার কয়েকটি আমন্ত্রণপত্র করেছিলেন সেগুলোর বিষয়বস্তু ছিল মুখ্যত উপস্থিতির অনুরোধ এবং বিশেষ সভার ঘোষণা ইত্যাদি। তাছাড়া ও তিনি মেসার্স ইউ. রয় এন্ড সন্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন।
ব্রাহ্মসমাজ ও সুকুমার রায় :-

সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্য ছাড়াও সুকুমার ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপরায়ন গোষ্ঠির এক তরুণ নেতা। সুকুমার রায় ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস কে সহজ সরলভাবে ব্যক্ত করে 'অতীতের কথা' নামক একটি কাব্য রচনা করেছিলেন। এই কাব্যটি ছোটদের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজের মতাদর্শের উপস্থপনা করার লক্ষে এই কাব্য গ্রন্থটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ওই সময়ের সবথেকে প্রসিদ্ধ ব্রাহ্ম ছিলেন, সুকুমার রায় তাঁর ব্রাহ্মসমাজের সভাপতিত্বের প্রস্তাবের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।


সাহিত্যকর্ম :

সুকুমার রায় বাল্যকাল থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যানুরাগী যা তার সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল।
সুকুমার রায়ের স্বল্পস্থায়ী জীবনে ও তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠ বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। সন্দেশের সম্পাদক থাকাকালীন তার লেখা ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ বাংলা শিশুসাহিত্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার অনন্য প্রকাশ তাঁর অসাধারণ ননসেন্স ছড়াগুলোতে। তাঁর প্রথম ননসেন্স ছড়ার বই ‘আবোল তাবোল’ শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে এক অনবদ্য সৃষ্টি। এটি ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৩ সালে ইউ রায় এন্ড সন্স থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই সংকলনে মোট ছড়ার সংখ্যা ৫০টি, যার মধ্যে ৭টি বেনামে লেখা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম ‘ননসেন্স ছড়া’র সূত্রপাত তার হাত ধরেই হয়েছিল। পরবর্তীকালে তার পুত্র সত্যজিৎ রায় কিছু ননসেন্স ছড়া রচনা করেন যেগুলি তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম (১৯৮৬) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবে। ইংরেজি সাহিত্যের কয়েকজন বিখ্যাত ননসেন্স ছড়ার লেখক হলেন  এডওয়ার্ড লিয়ার, লুইস ক্যারল, মারভিন পিক, এডওয়ার্ড গোরি, কলিন ওয়েস্ট, ডক্টর সেউস, ও স্পাইক মিলিগান। সুকুমার রায়ের একটি ননসেন্স ছড়া নিম্নরূপ :-
““মাসী গো মাসী পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে সিম,
হাতির মাথায় ব্যাঙের বাসা
কাগের বাসায় বগের ডিম।”
তাছাড়া তাঁর রচিত রম্য রচনা ‘হ-য-ব-র-ল’ (১৯২১) বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স ধারার একটি শ্রেষ্ঠ রচনা। জায়িনী বসু ২০০৫ সালে বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাছাড়া ছোটদের কাল্পনিক গল্প নিয়ে লেখা তাঁর আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘পাগলা  দাশু’(১৯৪০)। সুকুমার রায়ের ননসেন্স ধরনের শিশুসাহিত্য গুলি সমগ্র বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যে সর্বযুগের সেরা বলে গণ্য করা হয়। অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড ইত্যাদি কয়েকটি মুষ্টিমেয় ধ্রুপদী সাহিত্যই যার সমকক্ষ। সুকুমার রায় অনেকগুলি নাটক রচনা করেন তারমধ্যে ‘ঝালাপালা’, ‘লক্ষণের শক্তিশেল’ উল্লেখযোগ্য। সুকুমার রায় শুধুমাত্র ব্যঙ্গ রসাত্মক কাব্য অথবা শিশুমন উপযোগী গল্প লিখে থেমে থাকেননি।  তার রচিত প্রবন্ধ গুলি ও বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে।তার রচিত প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা ‘সূক্ষ্ম হিসাব’ ১৯১৩ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার রচিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হলো ‘কাঠের কথা’, ‘চাঁদমারি’, ‘পাতালপুরী’ ‘ক্লোরোফরম’, ‘ আশ্চর্য আলো’, ‘কয়লার কথা’, ‘শরীরের মালমশলা’, ‘বায়োস্কোপ’ প্রভৃতি ।
সুকুমার রায়ের অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ‘চাঁদমারি’ প্রবন্ধেও।আমেরিকান বিজ্ঞানী রবার্ট এইচ. গডার্ড,যিনি বিশ্বের প্রথম লিক্যুইড-ফুয়েলড রকেটের আবিষ্কর্তা হিসেবে খ্যাত, ১৯২০ সালে প্রথম বহুস্তর বিশিষ্ট রকেটের প্রথম সফল পরীক্ষণ করেন।এর কিছুদিন পর ১৯২১ সালে সুকুমার রায় ‘চাঁদমারি ‘ রচনা রচনা করে মানুষের চাঁদে পাড়ি দেবার বিষয়ে ভবিষৎবাণী করেছিলেন -
“হয়ত তোমরা সব বুড়ো হবার আগেই শুনতে পাবে যে চাঁদের দেশের প্রথম যাত্রীরা চাঁদে যাবার জন্য রওনা হয়েছে!তারা যদি গিয়ে ফিরে আসতে পারে,তাহলে কত যে আশ্চর্য অদ্ভুত কাহিনী তাদের কাছে শুনতে পাবে,তা এখন কল্পনা করাও কঠিন!”
সেই ভবিষ্যৎবাণী সফল হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ২১শে জুলাই চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের পদার্পণের মধ্য দিয়ে। তার কয়লার কথা প্রবন্ধ টি আত্মকথা ধরনের রচনা। তার রচনার মধ্য দিয়ে কয়লা যেন হয়ে উঠেছে জীবন্ত এবং তার জীবনের নানা  দুঃখের কথা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়। সমগ্র বিশ্বে যখন রেডিও এক যুগান্তকারী সূচনা

Bishwajit Bhattacharjee, [13.06.21 21:54]
হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে তখন বাংলা সাহিত্যে তাঁর সঠিক প্রতিশব্দ ছিল না। অনেকেই তার প্রতিশব্দ হিসেবে টেলিফোন শব্দটি ব্যবহার করেন। সুকুমার রায় প্রথম  ‘আকাশবাণী’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে ‘আকাশবাণীর ফল’ শিরোনামের প্রবন্ধটি রচনা করেন। তিনি কাঠের কথা প্রবন্ধে আমাদের বৃক্ষচ্ছেদন এর কুফল সম্পর্কে অবগত করেছেন। কাঠের কথা প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি বলেছেন —
“ ‘সভ্য’ জাতিদের মধ্যেও কাঠের ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে চলেছে,কমবার লক্ষণ একটুও দেখা যায় না।প্রতি বৎসরে এত কোটি মণ কাঠ মানুষে খরচ এবং তার জন্য এত অসংখ্য গাছ কাটতে হয় যে অনেকে আশঙ্কা করেন,হয়ত বেহিসাবী যথেচ্ছ গাছ কাটতে কোন্ দিন পৃথিবীতে কাঠের দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হবে!”
সুকুমার রায় যে কেবল একজন সাহিত্যিক ছিলেন তা নয় তিনি একজন দূরদর্শী পন্ডিত ছিলেন বটে। তাঁর রচনা থেকে তার প্রত্যক্ষ দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়।




রচনাবলি :-
কাব্যগ্রন্থ:-
আবোল তাবোল(১৯২৩)
খাই-খাই(১৯৫০)
অতীতের কথা
গল্প:-
পাগলা দাশু(১৯৪০)
হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়েরি
হ য ব র ল(১৯২১)
বহুরুপী(১৯৪৪)
ভাষার অত্যাচার (১৯১৫, Torture of Language)

নাটক:-
অবাক জলপান
লক্ষণের শক্তিশেল
ঝালাপালা,
চলচিত্তচঞ্চরী,
হিংসুটে,
ভাবুকসভা,
শব্দকল্পদ্রুম,

প্রবন্ধ :-
চাঁদমারি(১৯২১)
কাঠের কথা
ক্লোরোফরম
আশ্চর্য আলো
কয়লার কথা
শরীরের মালমশলা
অতিকায় জাহাজ
উঁচু বাড়ি
কাগজ
গরিলা
গরিলার লড়াই
বেবুন
জাহাজ ডুবি
ডুবুরি জাহাজ
ডুবুরী
পাতালপুরী
পার্লামেন্টের ঘড়ি
রাবণের চিতা
লুপ্ত সহর
শিকারী গাছ
সূক্ষ্ম হিসাব(১৯১৩)
আকাশবাণীর ফল
সূর্যের কথা
শনির দেশে
সেকালের লড়াই
বিদ্যুৎ মৎস্য
রাক্ষুসে মাছ
অদ্ভুত মাছ
ভুঁইফোড়
বায়োস্কোপ

মৃত্যু :-

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে কালাজ্বরে (লেইশ্মানিয়াসিস) আক্রান্ত হয়ে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সুকুমার রায় মৃত্যুবরণ করেন। সুকুমার রায়ের মৃত্যুর বহু বছর পর ১৯৮৭ সালে তাঁর পুত্র সত্যজিৎ রায় তাঁর উপরে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রযোজনা করেন।

তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া ,বাংলা পিডিয়া,

Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content