রূপকথা ও উপকথা - E-Learning Bengali

Bengali E-Learning
Go to content
রূপকথা
রূপকথা হল ছোটগল্পের একটি ধরন, যাতে মূলত লোককথা ও ফ্যান্টাসি ধরণের চরিত্র, যেমন- বামন, ড্রাগন, ক্ষুদ্র পরী, দৈত্য, যক্ষ, গবলিন, গ্রিফিন, মৎসকন্যা, সবাকপ্রাণী, ট্রোল, কাল্পনিক ঘোড়া বা ডাইনি এবং জাদু বা জাদুমন্ত্র তোলে ধরা হয়। রূপকথা অন্যান্য লোককাহিনি, যেমন কিংবদন্তি এবং প্রাণীদের ভাষ্যে উপকথামূলক নীতিকথা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। এই শব্দটি দিয়ে প্রধানত ইউরোপীয় রীতির গল্প  বর্ণিত হয়ে থাকে এবং সাম্প্রতিক শতাব্দীর গল্পসমূহ, বিশেষ করে শিশু সাহিত্যের সাথে জড়িত। সমসাময়িক সাহিত্যে অনেক লেখক বিভিন্ন কারণে রূপকথা ধরনটির ব্যবহার করেছেন। একটি কারণ হল রূপকথার সাধারণ কাঠামো থেকে মানবীয় অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা।কয়েকজন লেখক আধুনিক বিষয়ের ক্ষেত্রে রূপকথার ব্যবহার করে থাকেন। মাঝে মাঝে বিশেষ করে শিশু সাহিত্যে কমিক ভাব আনার জন্য রূপকথাসমূহ যোগ করা হয়। একটি সাধারণ কমিক বিশেষত্ব হল রূপকথার ঘটনাবলী একটি কাল্পনিক জগতে ঘটে থাকে এবং গল্পের চরিত্র সমূহ তাদের ভূমিকার ব্যাপারে সচেতন থাকে।

ইংরাজীতে যাকে ফোকটেল (Folk tale) বলা হয়, তা সবরকম মৌখিক লোককাহিনিকেই বুঝায়। ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৬), ঠাকুর দাদার ঝুলি (১৯১১), ঠানদিদির থলে (১৯১১), দাদামশায়ের থলে (১৯২৮), উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরীর টুনটুনির বই (১৯১০), জসীমউদ্দীনের বাঙালীর হাসির গল্প (১৯৬০) প্রভৃতি সবরকম কাহিনিকেই ইংরাজীতে সার্বিক অর্থে ফোকটেল, বাংলায় লোককাহিনি বলা যেতে পারে। যে সব কাহিনিতে জীবজন্তুই প্রধান তাকে ইংরেজীতে এনিমেল টেল বা জীবজন্তুর গল্প বলতে পারি।যে সব জীবজন্তুর গল্পে উপদেশ থাকে যেমন-ঈশতের গল্প তাকে নীতিকথা বলা হয়। বিশেষ কোনো সম্প্রদায়, তন্তুবায়, ধর্মপ্রচারক প্রভৃতি মানুষের বোকামি বা বিশেষ কোন বোকামির ঘটনাবলী এবং গল্পগুলির বিষয়বস্তু-বাংলায় এগুলিকে "রঙ্গকথা' বা হাসির গল্প বলা যেতে পারে।

রূপকথাগুলি হল ঐতিহ্যবাহী রচনা, মৌলিক সৃষ্টি এগুলি নয়। রূপকথা রচিত হয় গদ্যে। আপাতভাবে রূপকথা অবাস্তব, অর্থহীন, উদ্ভট রচনা বলে মনে হলেও এগুলিতে এমন একটা সার্বজনীন আবেদন  থাকে, যা সহজেই পাঠককে টানে। রূপকথাগুলি রোমান্সধর্মী এবং সর্বশ্রেণির লোককথাগুলি মধ্যে জটিলতম। রূপকথায় যেসব চরিত্র উপস্থাপিত হয় সেগুলি নৈর্ব্যক্তিক। তাই রূপকথায় বর্ণিত হয় "এক যে ছিল রাজা, তার ছিল তিন রাণী', অর্থাৎ রাজা বা রাজপুত্রের নাম অনুল্লিখিত থাকে।শুধু যে উপস্থাপিত চরিত্রগুলিই নৈর্ব্যক্তিক তা নয় গল্পের প্রেক্ষাপট বা ঘটনাস্থল এমনকি যে সময়ের ঘটনা তা ও নৈর্ব্যক্তিক। রূপকথায় রূপক ও সঙ্কেতের প্রাচুর্য পরস্পর বিপরীতধর্মী চরিত্রের সমাবেশ রূপকথায় একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট। যেমন-রাক্ষসী ও রাজকন্যা। পন্ডিতেরা মনে করেন এপিকের তুলনায় রূপকথা প্রাচীনতর। এঁরা বলেছেন- এপিক-এ চরিত্র স্ব স্ব নামে পরিচিত হয়, উপস্থাপিত ঘটনাস্থল নির্দিষ্টনামে চিহ্নিত হয়,যা রূপকথায় লক্ষিত হয় না। রূপকথাগুলিতে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন লক্ষিত হয়। রাজকুমার রাজকন্যাকে বিবাহ করে রাজকন্যার পিত্রালয়েই থেকে যায়।অর্থাৎপুত্রসন্তান পিতৃরাজ্যের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত। রূপকথায় নৃতাত্ত্বিক উপাদানের প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। রূপকথাগুলির মানবিক দিক যেমন আছে তেমনি  অতিলৌকিকতাও পরিদৃশ্যমান। বিকলাঙ্গ শিশুর সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হওয়া কিংবা ঐন্দ্রজালিক ফল বা পাখির মাংসের ভক্ষনে সন্তানের জন্ম অতিলৌকিকতার পরিচয়বাহী। আপাতভাবে রূপকথাকে যতই শিশুদের উপভোগ্য কাহিনি বলে মনে করা হোক, একটু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে রূপকথাগুলি পরিনত বয়স্ক মানুষদেরই উপভোগ্য বিষয়।
উপকথা
উপকথা হলো সাহিত্যের একটি ধরন, যাতে বিভিন্ন প্রাণী, কিংবদন্তিতুল্য সৃষ্টি, উদ্ভিদ, জড়বস্ত এবং প্রাকৃতিক উপাদানকে মনুষ্য ক্ষমতা প্রদান করা হয় এবং তাদের ভাষাতে গদ্য বা পদ্য ছন্দে ছোট কাল্পনিক গল্প বিবৃত হয়। অর্থাৎ পশু-পাখির চরিত্র অবলম্বন করে যেসব কাহিনী রচিত হয়- তাকে সাধারণত বাংলায় উপকথা বলে। কাহিনিগুলির দুটি উদ্দেশ্য- প্রথমতঃ কৌতূকরস সৃষ্টি ও দ্বিতীয়তঃ নীতিপ্রচার। উপকথা নীতিকথা থেকে ভিন্ন, কারণ নীতিকথায় প্রাণী, উদ্ভিদ, জড়বস্তু ও প্রাকৃতিক উপাদানকে কথা বলা বা অন্যান্য মনুষ্য ক্ষমতা প্রদান মূল চরিত্র হিসেবে দেখানো হয় না। তবে এই দুইটির ব্যবহারের স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষনীয় নয়। কহিনিতে মানুষের চরিত্রগুলি পশুপাখির ছদ্মবেশে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। অরণ্যাচারী কিংবা পর্বত গুহায় বসবাসকারী মানুষ কেবলমাত্র বৃত্তি তাড়িত হয়ে জীবনধারণ করত। যে মননশীলতা বা বুদ্ধি মানুষকে পশু থেকে আলাদা করেছে- তা তখনও মানুষের মধ্যে ছিল না। পশুপাখির চরিত্র নির্ভর লোককথাগুলি আদিম জীবনের সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে রচিত।

বাংলার উপকথার যে সব পশুপাখির চরিত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে শৃগাল প্রধান। এছাড়া আর যে কয়টি জীবের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাদের স্থান প্রায় প্রত্যেকেরই সমান। পশুর মধ্যে বাঘ ও পাখির মধ্যে কাক, চড়ুই ও টুনটুনি লোক সমাজের প্রতিচ্ছায়া উপকথায় পশু সমাজের উপর বিস্তার লাভ করেছে।
উপকথার কয়েকটি বৈশিষ্ট হলো-
১. চরিত্রগুলি সাধারণত প্রাণী হয়।
২. বর্ণনাকারী।
৩. খুব সাধারণ কাঠামো।
৪. দৈর্ঘ্য।
৫. মানবিক সমস্যা।
৬. সমস্ত শ্রোতার জন্য উদ্দিষ্ট।
৭. সাহিত্যের সংস্থান।
৮. শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য।
৯. নৈতিকতা।

বাংলায় সংগৃহীত উপকথাগুলি হিন্দু সমাজ থেকে সংগৃহীত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, উপকথাগুলির মধ্যে হিন্দু সমাজের আদর্শ ও রুচির প্রভাব রয়েছে। কাহিনিগুলির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি সমবেদনা। বাঙালি চিরদিনই দৈহিক শক্তিতে দুর্বল। তার দৈহিক শক্তির অভাব সে মস্তিষ্কের বৃদ্ধির দ্ধারা পূর্ণ করতে চায়।সেজন্য লোক কথায় দৈহিক শক্তি সম্পন্ন জীবকে নিতান্ত নির্বোধ বলে উপহাস করা হয়েছে। তাই লোককথায় পশুর মধ্যে শৃগাল, পাখির মধ্যে টুনটুনি ও চড়ুই-এর কাছে হাতি, বাঘ, কুমির প্রভৃতি সকলে পরাজয় স্বীকার করে থাকে।

উপকথা বলতে এখন যেমন নির্দিষ্ট প্রকৃতির এক লোককথাকেই বোঝানো হয়ে থাকে, পূর্বে কিন্তু তেমনটি বোঝানো হত না। লোককথাকেই সাধারণভাবে উপকথা বলে অভিহিত করার রেওয়াজ ছিল। যেমন- শ্যামচরণ দে রচিত "বঙ্গের উপকথা'। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় আবার রূপকথা এবং উপকথাকে মোটামুটিভাবে সমগোত্রীয় বলে মনে করেছেন।বাংলার Animal Tale কে উপকথা বলে অভিহিত করেছেন প্রয়াত ড:আশুতোষ ভট্টাচার্য। বর্তমানে আমরা পশুকথা বলে থাকি উপকথার পরিবর্তে।
প্রবন্ধ: টিনা চন্দ
তথ্যসূত্র:
১.বঙ্গীয় লোক সংস্কৃতি কোষ, বরুণ কুমার চক্রবর্তী
২. উইকি পিডিয়া
৩. বাংলা পিডিয়া
(প্রকাশিত: ২৫.০৫.২০২১)
There are no reviews yet.
0
0
0
0
0

Website Developed by:
DR. BISHWAJIT BHATTACHARJEE
Assistant Prof. & Head
Dept. of Bengali
Karimganj College, Karimganj, Assam, India, 788710

+919101232388

bishwa941984@gmail.com
Important Links:
Back to content